Foto

৫০ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে এনবিআর


চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ হতে চললেও রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস জুলাই থেকে মার্চে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকার রাজস্ব। অর্থাত্ আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে ৫০ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।


পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে পূর্বের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থবছরের বাদবাকি সময়েও আদায়ে বড় উল্লম্ফন না হলে চলতি অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ে বিশাল ব্যবধানের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এনবিআর। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থবছরের বাদবাকি সময়ে রাজস্ব আদায়ে বড় উল্লম্ফন না হলে গত ১৯ বছরে এবারই সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হতে যাচ্ছে।

রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় চিন্তিত অর্থ মন্ত্রণালয়ও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সভায় রাজস্ব আদায়ে এত কম প্রবৃদ্ধিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

গত অর্থবছর রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। অথচ ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র সাত শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা এ ধরনের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবতা বিবর্জিত আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। আদায়ের সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার এত ব্যবধান ক্রমাগত চলতে থাকলে সরকারের রাজস্ব নীতির উপর মানুষ আস্থা হারাবে। অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, যেখানে অতীতে আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১৪ শতাংশ সেখানে ৪০ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতা বর্জিত।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, এত বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। অবশ্য এত কম হারে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গতবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ। তাহলে এবার ছয় সাত শতাংশে নেমে যাবে কেন? এর পেছনে কী কারণ তা খাতিয়ে দেখা উচিত। গত কয়েক বছর ধরে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার ফল দেখা যাচ্ছে না।

গত কয়েক বছর ধরেই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ার পর অর্থবছরের শেষ দিকে এতে সংশোধন করে কমিয়ে আনা হচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, এবারো সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয়ের এক সভায় লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে যে হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি শুল্ক খাতে। ৯ মাসে শুল্ক আদায় বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ২২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ৬২ হাজার ৮২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে শুল্ক আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। এছাড়া গত ৯ মাসে ৭৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৬০ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।

এ বিবেচনায় কিছুটা স্বস্তি আয়কর আদায়ে। ৬৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে আয়কর আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, শুল্ক ও ভ্যাট আদায় অস্বাভাবিক কম হওয়ায় অস্বস্তি রয়েছে এনবিআরে। স্বল্প শুল্কের ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য বন্দরে খালাস হয়ে যাচ্ছে কি না—এমন আলোচনা সম্প্রতি বেশ জোরালো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ প্রায়ই অভিযানে মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য আটক করে। তাতে দেখা যায়, বন্দর থেকে ওইসব পণ্য স্বল্প শুল্কের হিসেবে খালাস হলেও বাস্তবে সেসব পণ্যে শুল্কের পরিমাণ ছিল কয়েকগুণ বেশি।

অবশ্য এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াও নির্বাচনের আগে সরকার কয়েকটি খাতে করছাড় দিয়েছে। এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ছাড় দেওয়ায় এ খাত থেকে চলতি বছর প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব কমবে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবায় ভ্যাট ছাড় এবং কিছু খাতে কর ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের রপ্তানির উপর উেস কর ১ শতাংশ থেকে দুই ধাপে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনায় প্রায় ১ হাজার ২শ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম আসবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্বে।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ