Foto

৩ জেলার সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে মারণাস্ত্র


দক্ষিণন্ডেপূর্বাঞ্চলীয় তিন পার্বত্য জেলার ৫৪০ কিলোমিটার সীমান্তের অনেকটাই অরক্ষিত। এ ৩ জেলার সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে মারণাস্ত্র। বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরার অরক্ষিত সীমান্ত এবং মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত দিয়ে স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র আসছে।


দুর্গম হওয়ায় এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা অনেকটাই দুঃসাধ্য। সীমান্ত গলিয়ে আসা ভারী অস্ত্রের সংখ্যাও কম নয়। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে জোরদার অভিযান পরিচালনার দাবি করলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। এতে দিন দিন ওই অঞ্চলে বাড়ছে অস্ত্র চোরাচালান, ব্যবহার, অপহরণন্ডেখুনসহ নানাবিধ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে।

বিষয়টি ভাবনায় ফেলেছে স্থানীয় অধিবাসীদের। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘টার্গেট কিলিংয়ে’ মৃত্যু নিশ্চিত করতেই পাহাড়ে অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে ঘাতকচক্র। প্রতিটি হত্যাকান্ডের পরই ঘটনাস্থল থেকে যে গুলির খোসা উদ্ধার হয় তা প্রায় একই রকম। এগুলো ৭.৬২ মিলিমিটারের। বাঘাইছড়ি ৭ হত্যাকান্ডে এ ধরনের ৬টি খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করে পুলিশ।

এসব ‘গুলি’ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অস্ত্রেই ব্যবহার করা হয় বলে জানিয়েছেন মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। পাহাড়ে যৌথবাহিনীর অভিযান জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

ব্রাশফায়ারে গত বছরের মে মাসে নানিয়ারচরে সিক্স মার্ডার ও আগস্টে খাগড়াছড়িতে ৭ খুনের ঘটনাস্থলেও এ ধরনের গুলির খোসা উদ্ধার হয়। সর্বশেষ কাপ্তাইয়ে ৪ ফেব্রুয়ারির জোড়া খুনের ঘটনাস্থল থেকেও ১৭টি গুলির খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এসব ‘গুলি’ একেন্ডে৪৭ ও একেন্ডে২২সহ এম ফোরের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের বলে পুলিশ জানিয়েছে। বাঘাইড়িতে হত্যাকান্ডেসহ গত ৩ মাসে পাহাড়ের দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ২টি জোড়াখুনসহ ২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আর গত ১৫ মাসে প্রাণ গেছে ৯৭ জনের।

গত ১০ মাসে বড় তিনটি ঘটনার মধ্যে গতবছর ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান জেএসএস (সংস্কার) নেতা অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা ও পরদিন তার শেষকৃত্যে যোগ দিতে আসা গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ব্রাশফায়ারে ৬ খুন ও ১৮ আগস্ট খাগড়াছড়ি শহরে ব্রাশফায়ারে ৭ খুনের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত সোমবারের বাঘাইছড়ির হত্যাকান্ডে।

এ ঘটনায় দুই পোলিং কর্মকর্তা, ৪ আনসার সদস্যসহ নিহত হন ৭ জন। এ ছাড়া ৫ পুলিশ সদস্য, ১১ সরকারি কর্মকর্তান্ডেকর্মচারী, ১১ আনসার সদস্য, ৩ জন সাধারণ মানুষ, ১ জন গ্রাম পুলিশসহ ৩১ জন আহত হন। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মেরুকরণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বাড়ছে এ খুনোখুনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই আঞ্চলিক রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। খুনোখুনিগুলো চারটি আঞ্চলিক দলের দুটি ‘সমঝোতার’ জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এতদিন।

সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পাল্টাপাল্টি হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষও। কিন্তু এবারই প্রথম সরকারের নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটল। এ হামলাকে ‘রাষ্ট্রের ওপর হামলা’ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন এলাকাভেদে এখানে সরকারের সমান্তরাল শাসন চালাতে সশস্ত্র গ্রুপগুলো ‘দুঃসাহস’ দেখিয়ে চলছে। ঘটনাস্থলে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণ আর সন্তু লারমার জেএসএস চেয়ারম্যান প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা ভোট বর্জনের পর সহিংসতার হুমকি দেওয়ার ঘটনার জন্য সংগঠন দুটিকে দায়ী করা হচ্ছে।

অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করছে তারা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পাহাড়ে নিহত হয়েছেন ৬৭ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটে ৯০টি। গোলাগুলির ঘটনা ঘটে ৩৫টি। ১১৯টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ৩ হাজার ২৯৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ১৯৭ জন। এ সময়ে অপহৃত হন ৪৩৯ জন। গোলাগুলির ঘটনা ঘটে ২৮টি। ৩৫৪টি বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার ও ৪১১৭ রাউন্ড গুলি জব্দ হয়।

এর বাইরেও অনেক খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের দুমাসেই ভারী সাবমেশিনগান ও কার্বাইনসহ অন্তত ২০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ ২৭ জন আটক হন। এ সময়ে হত্যাচেষ্টার শিকার হন ৭ জন। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে ৪টি। এক নারীসহ অপহরণ হয়েছেন ৮ জন। এসব ঘটনায় আটকদের অধিকাংশই পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর সদস্য। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিবদমান পক্ষগুলো নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মজুদ করছে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। আর ‘শক্তি’ জানান দিতেই ঘটছে সংঘাতের ঘটনা।

প্রশ্ন উঠেছে কোথা থেকে আসছে এই অত্যাধুনিক অস্ত্র। স্থানীয়দের ধারণা, শান্তি চুক্তি হলেও অনেকেই চুক্তি অনুযায়ী তাদের অস্ত্র জমা না দেওয়ায় তা রয়ে গেছে অনেকের হাতে। তা ছাড়া বিভিন্নভাবে নতুন অস্ত্র সংগ্রহ করছে বিবদমান আঞ্চলিক দলগুলো। তৃতীয় কোনো পক্ষ এসব অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তারা। তাদের দাবি বিবদমান পক্ষগুলোর কাছে অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ হলে অনেকটা শান্তি ফিরে আসবে পাহাড়ে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, পাহাড়ে সমতলের জেলাগুলোর মতো সীমান্ত নেই।

ফলে অপরাধীরা সীমান্ত পেরিয়ে সহজেই চলে যেতে পারে। এ কারণেই কিন্তু আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেছেন, ‘হয়তো এমন হতে পারে অতীতে বহু বছর আগে সেনাবাহিনী, বিজিবিকে আক্রমণ করে সে সময় তারা অস্ত্রগুলো নিয়ে গেছে। এসব অস্ত্র শত বছর সচল থাকে। তারা চোরাচালান থেকেও অস্ত্র পেতে পারে। মিয়ানমার থেকে আনতে পারে। অতীতে কোন সময় তারা যেসব সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, সেময় যদি কোনো অস্ত্র বেহাত হয়ে থাকে সেগুলো যতœ করে রেখে এখন ব্যবহার করছে। অরক্ষিত সীমান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

আরও শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। সমতলের মতো পাহাড়ে সীমান্ত সড়ক করা ব্যয়বহুল ও দুরূহ। সরকার কোনোদিন করতে পারবে কিনা জানি না। তবে করতে পারলে ভালো’। অগ্রগতি নেই : ৬ দিনেও বাঘাইছড়ি হত্যাকান্ডে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আসেনি। হত্যাকান্ডের ৩ দিনের মাথায় থানার এসআই আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

গতকাল বিকালে ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (পরিদর্শক তদন্ত) জাহাঙ্গীর মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। অভিযান অব্যাহত আছে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬২ মিলিমিটারের ৬টি খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।’

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ