Foto

৩৭ নদী বাঁচবে তো


পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকাভুক্ত ৪০৫ নদ-নদীর মধ্যে ৩৭টি সবচেয়ে বেশি দখল-দূষণের শিকার। নদীবিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপল পরিচালিত এক প্রাথমিক সমীক্ষায় দখল-দূষণের এই চিত্র ফুটে উঠেছে। তারা এ নিয়ে একটি প্রাথমিক সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এখনও অপ্রকাশিত এই সমীক্ষায় সংগঠনটি তিন ধরনের দখল ও দূষণের তিন প্রকার উৎস চিহ্নিত করেছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যেসব নদ-নদী ইতিমধ্যে মৃত বা বিলুপ্ত, সেগুলো এই সমীক্ষার আওতার বাইরে।


রিভারাইন পিপল তাদের সমীক্ষায় যেসব নদী চিহ্নিত করেছে, এর মধ্যে রয়েছে- রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের বড়াল নদী; কুমিল্লা অঞ্চলের ডাকাতিয়া; চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী, হালদা; নেত্রকোনার মগড়া; খুলনার ময়ূর; হবিগঞ্জের খোয়াই ও সোনাই; সিলেট অঞ্চলের সুরমা, পিয়াইন, বিবিয়ানা, বাসিয়া; চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ অঞ্চলের নবগঙ্গা; টাঙ্গাইলের লৌহজং, লাঙ্গুলিয়া; ঢাকা অঞ্চলের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বংশী; কক্সবাজারের বাকখালী; ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র; রংপুরের ঘাঘট, ইছামতী; দিনাজপুরের পুনর্ভবা; বগুড়ার করতোয়া; নওগাঁ-জয়পুরহাটের ছোট যমুনা; নাটোরের নারোদ; কুড়িগ্রামের সোনাভরি; বরিশাল অঞ্চলের সন্ধ্যা; ফরিদপুরের কুমার; সাতক্ষীরার আদি যমুনা; যশোরের কপোতাক্ষ ও ভৈরব; নরসিংদী অঞ্চলের হাড়িধোয়া; গাজীপুরের চিলাই।

রিভারাইন পিপলের মহাসচিব এবং এই সমীক্ষার প্রধান গবেষক শেখ রোকন সমকালকে জানান, মূলত নগর সংলগ্ন নদ-নদীর দূষণ ও দখল নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু দখল-দূষণের থাবা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে। দখল উচ্ছেদ বা দূষণবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হয় মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীকে কেন্দ্র করে। এর বাইরের দখল হওয়া নদ-নদী প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগের বাইরে থেকে যায়। রিভারাইন পিপল ২০১৬ সাল থেকে দখল-দূষণের শিকার নদীর তালিকা হালনাগাদ করে আসছে। তালিকাভুক্ত সব নদ-নদী নিয়ে আলাদা ’একাডেমিক ডকুমেন্টেশন’ শেষে সমীক্ষাটি চূড়ান্ত হবে।

সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর পাশ দিয়ে বহমান নদীগুলো বেশি দখল-দূষণের শিকার। এগুলোতে শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ও নাগরিক বর্জ্য বেশি পতিত হয়। শেখ রোকন বলেন, ’৯০-এর দশক থেকে নদ-নদীতে দখল ও দূষণ বেড়েছে। একই সময়ে পরিবেশ ও নদী সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা প্রণীত ও নতুন নতুন সংস্থা গঠন হলেও দখল বা দূষণ হ্রাসে দৃশ্যত কোনো প্রভাব পড়েনি। তার মতে, দখল ও দূষণ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। প্রথমে দখল করে বাণিজ্যিক বা আবাসিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, তারপর সেগুলোর বর্জ্যে দূষণ শুরু হয়। সমকালের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে দখল-দূষণের শিকার নদীর আলাদা কোনো তালিকা পাওয়া যায় না।

ঢাকার ’প্রাণপ্রবাহ’ হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা নদী সবচেয়ে বেশি দখল ও দূষণের শিকার। এর আদি চ্যানেলের অধিকাংশ ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে পাকা অবকাঠামো ও সড়ক। এই নদী নিয়ে ’৯০-এর দশকের শেষভাগে গড়ে উঠেছিল ’বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন’। এর সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিহির চন্দ্র বিশ্বাস সমকালকে বলেন, প্রায় প্রতি বছরই নদীতে দখল উচ্ছেদ অভিযান চলে। তার মতে, এসব অভিযান অনেকটা ’লোক দেখানো’। বুড়িগঙ্গা দখলমুক্ত করতে তিনি ’বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা’ করে তারপর অভিযানে নামার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা নদীবন্দরের আওতাভুক্ত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের আওতাভুক্ত শীতলক্ষ্যা নদীতে দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক এবং ঢাকা নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেন, এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করায় ফের দখল ফিরে আসত। এখন ’টেকসই অভিযান’ পরিচালিত হচ্ছে। উচ্ছেদ অভিযানের একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনার ভগ্নাংশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করেন। ঢাকার চারপাশের নদীতে বালুর আড়ত দখলের নতুন চ্যালেঞ্জ বলে তিনি চিহ্নিত করেন। তুরাগের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বালুর আড়ত নিলামে দিলেও একই সিন্ডিকেট বেনামে কিনে নেয়। পরে আর সেগুলো সরায় না।

হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ে রাজধানীর পাশে প্রবাহিত তুরাগ নদকে ’আইনি সত্তা’ ঘোষণা করা হয়ছে। এই নদী তীব্র দূষণের শিকার। তুরাগ নদ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী সমকালকে বলেন, এর ফলে নদীটির তীরবর্তী সাধারণ মানুষ উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, তুরাগ দূষণের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। প্রশাসন যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে পারে, তাহলে তা কার্যকর হবে।

রিভারাইন পিপলের সমীক্ষায় দেখা যায়, কিছু নদ-নদী শুধু দখল বা দূষণের শিকার। আবার কিছু নদী একই সঙ্গে দখল ও দূষণের শিকার। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী নিয়ে গবেষণা করছেন ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি। তিনি সমকালকে বলেন, কর্ণফুলী জোয়ার-ভাটার নদী বলে এর দূষণের মাত্রা অনেক সময় কম চোখে পড়ে। বাস্তবে কেবল কর্ণফুলী নদী নয়, এর ৩০টি সংযোগ খালও চরম দূষণের শিকার। নগরীর ৬০ লাখ মানুষের সব ধরনের বর্জ্য সরাসরি এসব খাল ও মূল নদীতে পতিত হচ্ছে। ড. ইদ্রিস আলি বলেন, জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অন্তত ৫-৬ শতাংশ থাকা দরকার। কিন্তু কর্ণফুলীতে এই মাত্রা সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তার মতে, কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে অবস্থিত ৩০টি শিল্প-কারখানার রাসায়নিক দূষণ যদি উৎসেই শোধন করা যায়, তাহলে সুফল মিলতে পারে।

রিভারাইন পিপলের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৭ নদ-নদীতে তিন ধরনের দখল রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে স্থায়ী আবাসন বা বাণিজ্যকেন্দ্র ছাড়াও সরকারি অপরিকল্পিত স্থাপনার মাধ্যমেও নদ-নদী দখলের শিকার হচ্ছে। অপরিকল্পিত স্থাপনা বলতে পরিকল্পনাহীন ও অবৈজ্ঞানিকভাবে নির্মিত আড়াআড়ি সড়ক, বাঁধ ও স্লুইসগেটকে নির্দেশ করেছে সংস্থাটি। এমন দখলের শিকার বৃহত্তর রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের বড়াল নদী। আশির দশকে এই নদীর সঙ্গে গঙ্গার সংযোগস্থলসহ ভাটিতে তিনটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে পাবনার কাবিখা ও কাবিটার অর্থে নির্মিত হয় আড়াআড়ি সড়ক। এর ফলে নদীটি বদ্ধ হয়ে পড়ে এবং নাটোরের বনগ্রাম এলাকায় একটি ধারা দখলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এসএম মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, তাদের আন্দোলনের ফলে সরকারের পক্ষে নদীটি উদ্ধারের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। ইতিমধ্যে চারটি মাটির বাঁধ ও একটি স্লুইসগেট উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু নদীতীরবর্তী ১০টি উপজেলার বিভিন্ন পৌরসভা, বাজার, হাসপাতাল ও পোলট্রি খামার থেকে বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হওয়ায় এখন চরম দূষণের শিকার। তিনি বলেন, শুধু দখল উচ্ছেদ করে একটি নদী প্রাণ ফিরে পেতে পারে না। দূষণমুক্তও জরুরি। মিজানুর রহমান বলেন, বড়াল নদীর অবস্থান নিয়ে ২০১০ সালে রিভারাইন পিপল একটি ’একাডেমিক ডকুমেন্টেশন’ করে। এখন দূষণ নিয়ে কাজ হওয়া দরকার।

’নদী বাঁচাও, বগুড়া’ সংগঠনের সদস্য সচিব মো. জিয়াউর রহমান সমকালকে বলেন, করতোয়া নদী নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলনের ফলে সম্প্রতি একনেকে ওই নদীসহ নাগর ও বাঙালি নদী পুনরুদ্ধারে একটি প্রকল্প পাস হয়েছে। কিন্তু এতে স্লুইসগেট উচ্ছেদ না করে নতুন করে স্লুইসগেট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। জিয়াউর রহমান বলেন, তারা মুক্ত নদী চান। নদীতে কোনো ধরনের স্থাপনা থাকা চলবে না।

রিভারাইন পিপলের সমীক্ষায় ৩৭ নদ-নদীতে দূষণের তিন ধরনের উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে- শিল্প-কারখানার রাসায়নিক দূষণ; নাগরিক বর্জ্য দূষণ; নৌযানের দূষণ। শেখ রোকন সমকালকে বলেন, আইন মেনে শিল্প-কারখানা স্থাপন করলে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি থাকলেই দূষণের হার অনেক কমে যাবে। তিনি ট্যানারি শিল্পের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আগে এটি বুড়িগঙ্গা নদী দূষণ করত। এখন সাভারে সরিয়ে নেওয়ার ফলে ধলেশ্বরী দূষিত হচ্ছে। কারণ এর কেন্দ্রীয় বর্জ্য সংশোধনাগার ঠিকমতো কাজ করছে না।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ