Foto

১০ বছরে পাসের হার সর্বনিম্ন


• আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে একধরনের অসামঞ্জস্য ছিল • কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নম্বর দেওয়ার অভিযোগ ছিল • এখন একটি মডেল উত্তরপত্র করে তার ভিত্তিতে খাতা দেখা হয় • ঢালাও নম্বর পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে।


সমালোচনা সঙ্গে নিয়েই প্রতিবছর বাড়ছিল উচ্চমাধ্যমিকের পাসের হার, একই সঙ্গে বাড়ছিল অস্বস্তিও। এখন উল্টো পথে হাঁটছে ফলাফল। এইচএসসিতে এ বছর পাসের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম-৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা ২০১২ সালে বেড়ে হয়েছিল ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূলত তিনটি কারণে এবার পাসের হার কমেছে। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় এবার অনেকেই ভালোভাবে না পড়ে পাসের সুযোগ নিতে পারেননি। অস্বাভাবিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধারা বন্ধ করে খাতা দেখার চেষ্টা করেছেন পরীক্ষকদের অনেকেই। এ ছাড়া ইংরেজি ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র বেশ কঠিন হয়েছিল। আর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে মানবিকের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক খারাপ করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এবার গড় পাসের হার গত বছরের চেয়ে ২ দশমিক ২৯ শতাংশ কম। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৫ হাজার ৫৬২ জন। গতবারের চেয়ে জিপিএ-৫ কমেছে ৭ হাজার ৬৮০। অথচ ২০১৪ সালেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৭৮৯ জন পরীক্ষার্থী।

শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার মতে, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে একধরনের অসামঞ্জস্য ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নম্বর দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এখন একটি মডেল উত্তরপত্র করে তার ভিত্তিতে খাতা দেখা হয়। এ কারণে ঢালাও নম্বর পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবার জন্য বাধ্যতামূলক ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছেন, যার ধাক্কা পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর। এবার শুধু সিলেট শিক্ষা বোর্ড বাদে বাকি সাতটি শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে। এবার ইংরেজির প্রশ্নপত্রও কঠিন হয়েছিল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, এবার আইসিটি এবং পদার্থবিজ্ঞানেও গতবারের চেয়ে খারাপ করেছেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, পদার্থের প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছিল। ঢাকা বোর্ডে পদার্থে পাসের হার ৮৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। অথচ গতবার এ বিষয়ে পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এই ফলকে খারাপ বলছেন না। সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন হওয়ায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে এবার শিক্ষার্থীরা কিছুটা খারাপ করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগেই পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ, পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে কোন সেট প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে, তা ঠিক হয়। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ নিতে পারেননি পরীক্ষার্থীরা। আগে দেখা যেত, পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে, বিশেষ করে এমসিকিউ প্রশ্ন ফাঁস হতো এবং সহজেই পরীক্ষার্থীরা তা সমাধান করতে পারতেন। এবার কড়াকড়ির কারণে দেখাদেখির প্রবণতাও কম ছিল।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল বলেছেন, তাঁরা এখন গুণগত মানের ওপর জোর দিচ্ছেন। খাতা মূল্যায়ন যেন সঠিকভাবে হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেশি পাস করলেও অপরাধ, কম পাস করলেও অপরাধ।

মন্ত্রী দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন। আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৮ জন। তবে মাদ্রাসা, কারিগরিসহ ১০টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৯ হাজার ২৬২ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত দু-তিন বছর বাদে, আগের কয়েক বছর তাঁরা বহুবার বলেছেন যে হারে জিপিএ-৫ বা পাসের হার বেড়েছে, সে হারে শিক্ষার মান বাড়ছে না। হয়তো তখন উদারভাবে খাতা দেখায় অনেকে যোগ্য না হয়েও জিপিএ-৫ পেয়েছেন বা পাস করে গেছেন। এখন সঠিকভাবে খাতা দেখার চেষ্টায় ফলাফল পরিপূর্ণ না হলেও সত্যের কাছাকাছি এসেছে। তাঁরা চান আরও সঠিকভাবে খাতা দেখা হোক।

এগিয়ে বরিশাল, পিছিয়ে দিনাজপুর
এইচএসসিতে এবার পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৭০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৬ দশমিক ১৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৬ দশমিক ৫১ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, যশোরে ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৬২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং সিলেট বোর্ডে ৬২ দশমিক ১১ শতাংশ।

এগিয়ে মেয়েরা 
এইচএসসিতে ছাত্রীদের পাসের হার ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৬০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা এগিয়ে আছেন। ৪০০টি প্রতিষ্ঠান থেকে সব পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। গতবার এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ৫৩২ টি। যত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, তাঁদের ৮৩ শতাংশই বিজ্ঞানের।

Facebook Comments

" লেখাপড়া " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ