Foto

হামলা গ্রেপ্তারের মুখেও মাঠে থাকবে ঐক্যফ্রন্ট


• উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার রাতে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের জরুরি বৈঠক • যতই বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, কোনোভাবেই মাঠ ছাড়বে না বিরোধীরা • বিএনপি ভাবছে, ভোটারদের উপস্থিতি ব্যাপক হলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে


নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর বিচার চাইতে গিয়ে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) আচরণ দেখে নেতারা আরও হতবাক হয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ভোট থেকে সরাতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পরিকল্পিত ছকে এগোচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল মঙ্গলবার রাতেই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নীতিনির্ধারকেরা গুলশানের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বৈঠকে আলোচনা হয় সরকারি দল, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতই বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হোক, কোনোভাবেই মাঠ ছাড়া যাবে না। সরকার একতরফা নির্বাচনে আর কী কী করতে পারে, তা চূড়ান্তভাবে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উন্মোচন করার জন্য শেষ পর্যন্ত মাটি কামড়ে মাঠে থাকতে হবে। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মনে করছেন, কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি যাতে বাড়ে, সে লক্ষ্যে চেষ্টা চালানোই এখন তাঁদের মূল কাজ। কারণ, ভোটাররা ব্যাপকভাবে কেন্দ্রে গেলে সরকারি দলের নির্বাচনী ছক কাজ করবে না।

বিএনপি মনে করছে, পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারা দেশে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে একের পর এক হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো ঘটছে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল বিকেলে নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসি কে এম নুরুল হুদা ও ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের মধ্যে অপ্রীতিকর ও উত্তপ্ত তর্কবিতর্ক বিএনপি ও জোট নেতাদের উদ্বেগে ফেলেছে। তাঁরা সিইসির অবস্থানকে প​রিকল্পিত মনে করছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ধাপে ধাপে সরকারি দল হামলা ও বাধা দিচ্ছিল। এখন সেটার মাত্রা বেড়ে গেছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এসে প্রচারে হামলার পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সরাসরি প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাছাই করা নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশের হুমকি-ধমকিও বেড়ে গেছে।

বিএনপির নির্বাচনী মনিটরিং সেল ও কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ২৪ দিনে ধানের শীষ প্রতীকের ২৮ জন প্রার্থী ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলার শিকার হয়েছেন। একাধিক প্রার্থী পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন।

ওই সূত্রের তথ্যমতে, এই ২৪ দিনে সারা দেশের ৩০০ আসনে ২ হাজার ৪৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩ হাজার ৩৪৭ জন নেতা-কর্মী ও সমর্থক আহত হন। সর্বশেষ গতকাল ঢাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় হামলার শিকার হন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩) ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী (ঢাকা-৬)। এর আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী হামলার শিকার হন। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে এবং মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত শত শত অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো অভিযোগেরই প্রতিকার মেলেনি।

অবশ্য ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনে অসহ্য পরিবেশ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অসহ্য হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত একটা গণবিস্ফোরণ হয়ে যেতে পারে, অথবা চরম স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত আন্দোলনেরই জয় হবে।’

বিএনপির নেতারা বলছেন, তাঁদের ধারণায় ছিল না যে পরিস্থিতি এতটা নাজুক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে এবং নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতাসীনদের পক্ষে এতটা ভূমিকা পালন করবে। তাঁরা মনে করছেন, সরকারি দলের অব্যাহত হামলা ও গ্রেপ্তারের পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে বিএনপি ও মিত্র জোটকে যেকোনো মূল্যে ভোটের মাঠ ছাড়া করা এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি ছড়ানো; যাতে মানুষ কেন্দ্রবিমুখ হয়। বিশেষ করে, সরকার তরুণ ভোটারদের ভয় পাচ্ছে। কারণ, ১০ বছর আগে ভোটার হয়েও তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। সব মিলিয়ে তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ হবে। তাঁরাই ভোটে বড় ভূমিকা রাখবেন। দলীয় পরিচয়ে চাকরি দেওয়া, সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছাত্রছাত্রীদের বিশাল একটি অংশ সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট। তরুণদের এই অংশটিকে ভোটের মাঠে পাশে পাবে বলে আশা করছে বিএনপি। তাই বিএনপি ভোটে থাকলে তরুণ ভোটাররা কী করে বসেন, তা নিয়ে একধরনের শঙ্কা বা অস্বস্তিতে আছে ক্ষমতাসীন দল।

ইতিমধ্যে তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা কামাল হোসেন ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম পৃথক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কামাল হোসেন বলেছেন, তরুণদের হাত ধরে একাত্তরের ডিসেম্বরের বিজয়, নব্বইয়ের গণতন্ত্র এসেছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ হারবে না। ২০১৮-এর ডিসেম্বরেও তরুণেরা জেগে উঠবেন। আর মির্জা ফখরুল তাঁর ভিডিও বার্তায় তরুণদের ৩০ ডিসেম্বর সকাল সকাল ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার ভোটেই ঠিক হবে ​এ দেশের ভবিষ্যৎ। আপনার বিবেচনা যাঁকে বলে, তাঁকেই ভোট দিন।’

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা মনে করছেন, সরকার ও প্রশাসন যতই নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করুক, কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতিই যেকোনো ধরনের বৈরী পরিস্থিতি পাল্টাতে সক্ষম হবে।

গতকাল নির্বাচন কমিশন থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকেরা জানতে চান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন করবে কি না। জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এ বিষয়ে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমরা এবার ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেব না।’ আগের দিন সোমবার ঐক্যফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকব।

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ