Foto

স্বেচ্ছায় রক্তদান নিয়ে যত ভুল ধারণা


স্বেচ্ছায় রক্তদান একটি মহৎ কাজ। রক্তদাতাদের এই মহৎ প্রচেষ্টায় বেঁচে যায় অনেক মুমূর্ষু জীবন। থ্যালসেমিয়ায় আক্রান্তদের জন্যও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি উপকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কিন্তু স্বেচ্ছায় রক্তদান নিয়ে আমাদের সমাজে রয়েছে অনেক ভুল ধারণা। এই ভুল ধারণাকে কাটিয়ে উঠে স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানুষ যত বেশি এগিয়ে আসবে তত কল্যাণ হবে পৃথিবীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সব মানুষই স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে পারেন। তবে রক্তদানের কিছু শর্ত পূরণ করেই কেবল রক্তদাতা নিয়মিত সময় অন্তর রক্তদান করতে পারেন।


দেহের ওজনের বিবেচনায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দেহে গড়পড়তা পাঁচ লিটার রক্ত থাকে। প্রতিবার রক্তদানের সেশনে ৫০০ মিলিলিটার করে রক্ত নেওয়া হয়। রক্তদানের পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন রক্ত তৈরি হয়ে সেই ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। প্রতি ১২০ দিন অর্থাৎ প্রতি চার মাস পরপর রক্ত যেসব কণিকা দ্বারা তৈরি সেসব কণিকা মারা যায়। ৪ মাস পরপর নতুন রক্ত তৈরি হয়। তাই এই রক্ত নষ্ট না করে প্রতি চার মাস পরপর রক্তদান করা যায়। রক্ত দান করলে শরীরের যেসব জায়গা থেকে রক্ত উত্পন্ন হয় তা বেশি সক্রিয় হয়। ফলে নিয়মিত রক্তদান করলে অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়।

স্বেচ্ছায় রক্তদান নিয়ে সমাজে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে তার একটি নিরামিষাশীরা স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে পারেন না। কিন্তু এই তথ্যটি পুরোপুরি সত্য নয়। মূলত নিরামিষাশীদের রক্তে আয়রনের মাত্রা কম থাকে বলেই অনেক সময় চিকিত্সকরা তাদের রক্তদানের ক্ষেত্রে কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করেন। সাধারণত মনে করা হয়, নিরামিষাশীদের খাদ্যে আয়রন কম থাকে। কিন্তু যদি ওই ব্যক্তি নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন তাহলে তার রক্তে আয়রন কম থাকার কোনো ঝুঁকি থাকে না। রক্তদাতার রক্তে আয়রন স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে রক্তদানে কোনো বাধা নেই। এই কারণে অনেক দেশে রক্তদানের আগে রক্তদাতার রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করে দেখা হয়। যদি দেখা যায় রক্তদাতার রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকে অর্থাত্ অ্যানিমিয়ায় ভুগে তাহলে তাকে রক্তদান থেকে বিরত রাখা হয়। এসব সমস্যা না থাকলে অন্য আট দশ জনের মতো তিনিও রক্ত দিতে পারেন।

অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা, শিশু কিংবা বয়োবৃদ্ধ হলে রক্তদানে নিরুত্সাহিত করা হয়। যারা এইচআইভি পজিটিভ (এইডস আক্রান্ত), হেপাটাইটিস, সিফিলিস, টিবি এবং রক্ত-বাহিত আরো কিছু রোগে আক্রান্ত তারা রক্তদান করতে পারেন না। ঠান্ডা, সর্দিজ্বর, খুশখুশে কাশি, পেট খারাপ থাকলেও রক্তদান করতে পারেন না। যে কোনো অসুখ থেকে সম্পূর্ণভাবে সেরে ওঠার ১৪ দিন পর সাধারণত রক্তদান করতে দেয়া হয়। কেউ যদি অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে থাকেন তাহলে কোর্স শেষ হওয়ার সাত দিন পর রক্ত দেওয়া যায়। অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রে একেক দেশে একেক রকম নিয়ম রয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা কিংবা প্রসূতি হলে, শিশুকে স্তন্যদান করলে কিংবা অ্যাবোরশন হলে, রক্তে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রক্তদানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। নিয়মিত রক্তদানকারীদের কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। কোনো কোনো দেশে এটি ৬০-৭০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা, ’ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচার’, যেমন বহুগামিতা, অর্থের বিনিময়ে যৌনসংগম, পুরুষ সমকামিতা ইত্যাদি রক্তদানে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই রক্তদানের অনুমতি দেওয়া হয়। ইনজেকশনের মাধ্যমে যারা নেশা করেন তারাও রক্ত দিতে পারেন না। মশা বাহিত ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং জিকা ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে যেসব দেশ থেকে আসা কারো দেহ থেকে রক্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। অনেক দেশই ’ঝুঁকিপূর্ণ’ কাজে নিয়োজিতদের থেকে রক্ত গ্রহণ করা হয় না। তবে এক্ষেত্রে ব্যাপক-ভিত্তিক কোনো নিষেধাজ্ঞা সমাজে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

Facebook Comments

" লাইফ স্টাইল " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ