Foto

সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে অসদাচরণ


জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাত বছরের সাজা দেওয়া ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ের পুরোটা এখনো পড়িনি। তাই রায় বা তার পর্যবেক্ষণ বিষয়ে এই লেখায় কোনো মন্তব্য করছি না। তবে যতটা পড়েছি, তাতে যেদিকটি বিশেষভাবে নজর দেওয়ার মতো, সেটি হলো সাংসদদের সজাগ হওয়া।


কারণ এ রায়টি ২০১৫ সালে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ইসলামী ঐক্যজোটের সাংসদ মুফতি শহিদুল ইসলামের মামলায় আপিল বিভাগের দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছে। ওই মামলার আগ পর্যন্ত এটা নিশ্চিত ছিল না যে, সাংসদেরা পাবলিক সার্ভেন্ট বা সরকারি কর্মচারী বলে গণ্য হবেন কি না। ওই মামলায় হাইকোর্ট বলেছিলেন, সাংসদেরা সরকারি কর্মচারী নন। কিন্তু আপিল বিভাগ তা উল্টে দেন।

আপিল বিভাগের শুনানিতে সাংসদেরা কিরূপে নানা আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন, তার বিবরণ তুলে ধরে দুদক।

এটা ঠিক যে, আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মত–দ্বিমতের বিষয় আছে। কারণ সব সময় আমরা এটাই বুঝে এসেছি যে, সাংসদ আর সরকারি কর্মচারী দুই কিসিমের মানুষ; বরং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাংসদদের অবস্থানই ওপরে থাকবে। এমনকি তাঁরাই সরকারি কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু সাংসদেরা দিনে দিনে খুব বেশি মাত্রায় করমুক্ত গাড়ি নিয়ে তা বিক্রি করে দেওয়া, প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণসহ নানা আর্থিক অনিয়ম–দুর্নীতিতে তাঁদের নাম যুক্ত হলো। সংসদ ও সাংসদেরা তাঁদের গরিমা হারালেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে যতটা জানা গেল তা হলো, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের আওতায় কোনো সাংবিধানিক পদধারীকে বিচারের আওতায় আনার সরাসরি কোনো বিধান নেই। কারণ ওই আইনে যাঁরা পাবলিক সার্ভন্ট, তাঁদেরই বিচারের ব্যবস্থা আছে। পাকিস্তান আমলেও মন্ত্রী বা সাংসদেরা সরকারি কর্মচারী নন, সেই যুক্তি দুর্নীতি দমন আইনে অভিযুক্ত হওয়ার পর দেখানো হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা মরিয়া হয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারী নন। আর দুদক সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে, ঠিক এটাই প্রমাণ করতে। এর কারণ কী? দুদকের একজন আইনজীবী অকপটে বলেন, সেটা না হলে আমরা খালেদা জিয়ার বিচারই করতে পারতাম না। তাহলে এতকাল কীভাবে চলেছে? উত্তর পেলাম: দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গ আর ১০৯ ধারায় অ্যাবেটর বা যোগসাজশকারীর জন্য শাস্তি আছে। কোনো দুর্নীতির মামলায় সরকারি কর্মচারীকে মুখ্য অপরাধী এবং সাংসদকে সহযোগী করে এজাহার তৈরি করা হতো। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইনজীবীরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন যে, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার আওতায় সরকারি কর্মচারীদের শাস্তির যে বিধান আছে, তার আওতায় বিচার চলতে পারে না। তাই তাঁরা এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যান। সেখানে তাঁরা একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ পান ঠিকই, কিন্তু তা তাঁদের হতাশ করে।

বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান লিখেছেন, আসামি বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে দাবি করা হয় যে, মামলার ঘটনার সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তি হওয়ায় সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য হবেন না এবং সে কারণে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না ও সে কারণে ওই আইনের বিধান অনুসারে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

রায়ে লেখা হয়, স্বীকৃতমতেই জাতীয় সংসদে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে, সে দলই সরকার গঠন করে এবং জাতীয় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হন। ফলে প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এরপর জাতীয় সংসদ সদস্যরা সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য হবেন কি না, সে বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম শহিদুল ইসলাম মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন। রায় উদ্ধৃত করার পর আদালত লিখেছেন, সুতরাং আলোচনা থেকে এটা লক্ষ্য করা যায় যে আসামি বেগম খালেদা জিয়া সরকারি কর্মচারী নন মর্মে যে দায়মুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, উহা আইনগত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয় মর্মে আদালত মনে করেন। বিচারক তাঁর এই যুক্তির পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকার সময় পাকিস্তান আমলে প্রথমে বিশেষ জজ আদালত দ্বারা দণ্ডিত এবং পরে হাইকোর্টে বেকসুর খালাস পাওয়ার তথ্যও হাজির করেন। গণতন্ত্রের মানসপুত্রখ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কী কী আইনি যুক্তি নিবেদন করেছিলেন, তারও উল্লেখ আছে।

রায়ের দণ্ড প্রদান অংশে আদালত বাংলায় লিখেছেন, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ওই ধারায় অপরাধমূলক অসদাচরণ সম্পর্কিত অর্থ সম্পদ বা সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। এই মামলার ৪ জন আসামির মধ্যে আসামি বেগম খালেদা জিয়া ঘটনার সময়ে এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তা ছাড়াও উক্ত পদে আসীন থাকার সময় তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন ছিলেন। একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শহীদ জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ জোগাড় করতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন মর্মে সাক্ষ্য পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে। তিনি কখন ও কীভাবে উক্ত ট্রাস্টের অনুকূলে টাকা জমা ও খরচ করেন, সে বিষয়টি প্রসিকিউশনপক্ষ সাক্ষ্য–প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

রায়টির উপসংহারে বলা হয়, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন থেকে অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ট্রাস্টের অনুকূলে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, উহা কখনোই কাম্য হতে পারে না বা উচিতও না। তাই ভবিষ্যতে যাতে অনুরূপ দায়িত্বে থেকে কেউ ওই ধরনের অপরাধ সংঘটন করতে উৎসাহিত না হন, তার জন্য উক্ত আসামিকে কঠোর শাস্তি প্রদান করা অত্যাবশ্যক।

বিএনপি এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছে, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আরেকটি রায়। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তারা আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ