Foto

সবকিছু হাতের মুঠোয় চান ট্রাম্প


সিআইএর সাবেক পরিচালক জন ব্রেনানের সরকারি তথ্য পাওয়ার অধিকার রদ করে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনিতে ট্রাম্প দৃশ্যত সীমাহীন প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ। কিন্তু ব্রেনানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প যে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই আরোপ করেছেন, তা ভাবা মোটেও ঠিক হবে না।


এ কথা সত্যি যে ব্রেনান বেশ কয়েকবারই ট্রাম্পের আচার-আচরণ ও রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থাকাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছেন। সে কারণে তাঁর ওপর ট্রাম্পের খাপ্পা হওয়ারই কথা।

কিন্তু ব্রেনানের ওপর নিষেধাজ্ঞার পেছনে ব্যক্তিগত রেষারেষির বাইরে আরও বড় কারণ আছে বলে মনে হয়। দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ট্রাম্প গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আক্রমণ করে আসছেন। এখন তিনি ব্রেনানের গালে চপেটাঘাত করে সব কটি গোয়েন্দা সংস্থাকে পরোক্ষভাবে পদানত করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই কাজ পশ্চিমা দেশগুলোর গণতন্ত্রের জন্যও স্বাস্থ্যকর হয়নি। কারণ, ইউরোপের জনতুষ্টিবাদীরাও ট্রাম্পের ওই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা শুরু করে দিয়েছে।

ইউরোপে যেসব ডানপন্থী দল ক্ষমতায় চলে এসেছে, তারাও এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে হাতের মুঠোয় রাখার বিষয়ে আদাজল খেয়ে নেমেছে।

অস্ট্রিয়ার জনতুষ্টিবাদী নেতারা দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ভয় দেখিয়ে ও তাদের মুখে ঠুলি পরিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উগ্র দক্ষিণপন্থীদের ওপর নজরদারি করার কাজে নিয়োজিত একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে তল্লাশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।

স্মরণ রাখা দরকার, অস্ট্রিয়ান চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জের সরকারের অন্যতম শরিক দল ফ্রিডম পার্টি যাঁরা গঠন করেছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন সাবেক নাৎসি বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট এসএস বাহিনীর কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক খতিয়ে দেখার জন্য রবার্ট ম্যুলার যে তদন্ত চালাচ্ছেন, তা থামিয়ে দেওয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পায়ের নিচে রাখার চেষ্টা ট্রাম্প প্রথম থেকেই করে আসছেন। তিনি ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে পারেন, এমন কোনো স্পর্শকাতর তথ্য জন ব্রেনানের মতো সমালোচকের হাতে যাক, তা তিনি চাইবেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রেনানকে তথ্য দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনগতভাবে কতটুকু ঠিক?

মার্কিন আইনে বলা আছে, গোপন তথ্য নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন এবং তাঁর কারণে জাতি ঝুঁকিতে পড়েছে—এমন কোনো কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রীয় তথ্য দিতে নিষেধ করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে।

কিন্তু ব্রেনান তো তেমন কিছু করেননি। তাঁর বিরুদ্ধে তো রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করার কোনো রেকর্ড নেই। বিষয়টি ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন।

ব্রেনানের তথ্য পাওয়ার অধিকার স্থগিত করার কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি উল্টাপাল্টা আচরণ করেছেন ও এলোমেলো বক্তব্য দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে হাস্যকর।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, উল্টো ট্রাম্পই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পরিচালনাসংক্রান্ত আইন পরিষ্কার ও সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছেন। সিআইএর ১১ জন সাবেক পরিচালক ও উপপরিচালক এবং (আমিসহ) সিআইএর ৭০ জন সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, ব্রেনানের তথ্য পাওয়ার অধিকার হরণ করে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদের অপব্যবহার করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে সাবেক কর্মকর্তাদের বাক্‌স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি সৃষ্টি করেছেন।

কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত তো বদলানইনি, উল্টো হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেছেন, এ রকম নিষেধাজ্ঞা আরও আসছে। যাঁদের তথ্য পাওয়া ঠেকিয়ে দেওয়া হবে, তাঁদের মধ্যে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার একজন সাবেক পরিচালক ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার একজন সাবেক পরিচালকও আছেন।

এই হিট লিস্ট মোটেও কাকতালীয়ভাবে করা হয়নি। তাঁদের সবাই কোনো না কোনোভাবে রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক তদন্ত করার কাজের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের তথ্য পাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো রাজনীতিকদের দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত।

প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নৈতিক শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। এতে দিন শেষে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতিকেরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থেকে যদি নিজেদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে থাকেন, তাহলে রাজনীতির ওপর জনগণের আস্থা কমতে থাকবে।

আমি মনে করছি, ট্রাম্পের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণের শিকার শুধু ব্রেনান হননি, এর মাধ্যমে কার্যত সব আমেরিকানই এর শিকার হয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে সব আমেরিকানকেই এখন সোচ্চার হতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ