Foto

সঞ্চয়পত্র থেকে ৩ মাসেই লক্ষ্যের অর্ধেক ঋণ


বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার করার লক্ষ্য ধরেছিল, তার অর্ধেকের বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে তিন মাসেই। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির হালনাগাদ যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট ২২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।


মোট বিক্রি হওয়া এই ২২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদে ৮ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এই হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১৩ হাজার ৪১২ কোটি টাকা।

অথচ এবারের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করেছিল।

এ হিসাবে মাত্র তিন মাসেই সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের বেশি অর্থ ধার করে ফেলেছে সরকার।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।

বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ঋণ বা ধার হিসেবে গণ্য করা হয়।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ছে মন্তব্য করে অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত বলেন, রাজস্ব বাজেটের একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ শোধে ব্যয় হচ্ছে। এর সিংহভাগই সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে।

“শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং ব্যাংক আমানতের সুদের হার কমায় সবাই এখন নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকেছে। সে কারণেই প্রতি মাসেই বিক্রি বাড়ছে। বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা।”

“ঋণের বোঝা কমাতে সরকার কয়েক দফা সঞ্চয়পত্রের ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিলেও শেষ পর‌্যন্ত কমায়নি। নির্বাচনের আগে কমানোর কোন সম্ভাবনা নেই।

আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি মহিলাদের পরিবার এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো উচিৎ। বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা রাখতেই এটা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।”

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করবে বলে ঘোষণা দিলেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি।
“এখনও ব্যাংকে টাকা রাখলে ৪/৫ শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায় না। সঞ্চয়পত্র কিনলে ১২ শতাংশের মতো পাওয়া যায়। তাহলে মানুষ কেনো ব্যাংকে টাকা রাখবে,” প্রশ্ন করেন জায়েদ বখত।
সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে বলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে মে মাসে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কথা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

কিন্তু বাজেট অধিবেশনে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ অন্যান্য মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের দাবির পরিপেক্ষিতে শেষ পর‌্যন্ত অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাননি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেও অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেবারও একই কারণে কমানো হয়নি।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য ৫১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরমধ্যে অভ্যন্তরীণ সুদ শোধের জন্যই রাখা হয়েছে ৪৮ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা রাখা হয়েছে বিদেশী ঋণেল সুদ পরিশোধের জন্য।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। যারমধ্যে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।

তার আগের অর্থবছরে (২০১৬-১৭) মোট বিক্রি এবং নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৭৫ হাজার ১৩৫ কোটি এবং ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

বিক্রির লাগাম টেনে ধরতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১০ মে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ হার গড়ে ২ শতাংশ কমানো হয়েছিল।কিন্তু তারপরও বিক্রি কমেনি।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ