Foto

সংলাপের ভেতর বাহির ও যার যা প্রাপ্য


ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার অন্যতম একটি দফা হলো তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। এ নিয়ে সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম চান। তিনি বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করব, আপনারা সবাই মিলে একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম বলেন।’ এসময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কথা বলেননি। চুপ ছিলেন। এমনকি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনিও কিছু বলেননি।


সংলাপ নিয়ে আগ্রহীরা নিশ্চয়ই এ খবর পেয়ে গেছেন। আরো আছে খবর। এই সংসদের ১৫৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত- ড. কামাল হোসেনের এ কথার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনি তো ৭২-এর সংবিধান রচনা করেছেন। আপনি লিখিত বক্তব্যে বললেন যে, এই সংসদে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে কোনও প্রার্থী না থাকলে আমাদের কী করার আছে? তাছাড়া আপনি নিজেও তো বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন কি আপনি পদত্যাগ করেছিলেন?

হা হা… একেই বলে বাপের বেটি। আমি সমর্থন করি বা না করি, আপনি করেন বা না করেন শেখ হাসিনার বুকের পাটা অস্বীকার করতে পারবেন? স্বাভাবিকভাবেই এটি তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বঙ্গবন্ধু কখনো সত্য কথা বলতে পিছ পা হতেন না। অতীতের কথা থাক।

এখন প্রশ্ন ড: কামাল হোসেন কি টের পেয়েছেন যে ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়? ভদ্রলোক শেষ বয়সে এমন উত্তেজিত যে নিজের সবকথা ভুলে বসে আছেন। তাই শেখ হাসিনা তাকে তার কৃতকর্মের কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মাত্র। যে মানুষ নিজে বিনাভোটে নির্বাচিত হয়ে পদত্যাগ করেননি, তিনি আর একজনকে কী করে তা করতে বলেন? এ জন্যেই বলা হয় আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাবে।

ভোট যেমন হোক আর ভোটের ফলাফল যাই হোক, এবারের এই সংলাপ দীর্ঘকাল মানুষের মনে থাকবে। বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া রাজনীতিকে যখন কোনও নতুন শক্তি বা নবীন নেতৃত্ব, এমনকি বিএনপিও জাগাতে পারছিলো না তখন বয়স্ক কিছু মানুষ সেটা পারলেন। হতে পারে তাদের ব্যক্তি ইমেজ, অথবা হতে পারে তারা ঝানু খেলোয়াড়। যে কারণেই হোক তারা মরা নদীতে কিছুটা জোয়ার এনেছেন। সে জোয়ারে পরস্পর বিরোধী মানুষরা এক কাতারে মিলে, শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস দেখালেও তার সামনে গিয়ে নুনের পুতুলের মতো গলে গিয়েছেন। যার কারণ তাদের কোনও আদর্শ নাই। নাই কোনও ঐক্য। আপাতত যে ঐক্য দেখছেন তা যদি সত্য হতো তাহলে কী দুইদিন পর বি চৌধুরী গিয়ে বলতেন- তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞায় মুগ্ধ?

এই মুগ্ধতা কেন আমরা তা সহজেই অনুমান করতে পারি। কতটা মুগ্ধ তার চেয়ে বড় কথা এরা কতটা অসহায় আর একা। মূলত সম্মান প্রত্যাশী, সুযোগ সন্ধানী আর হারানো অতীতের লোভে পাগলপ্রায় এদের দেখে একটা বিষয় বুঝি, বাংলাদেশে একদিকে যেমন শেখ হাসিনার বিকল্প নাই তেমনি এটাও সত্য কোন নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। যা আছে তার নাম স্তাবকতা নয়তো অন্ধত্ব। আনুগত্যের নামে একদিকে যেমন মোসাহেবি আরেক দিকে দেখছি আশাহীনতা।

বি চৌধুরী এখন শেখ হাসিনাকে দেখে যতটা বিগলিত ঠিক ততটা বা তার ততোধিক বিরক্ত ছিলেন তার সুবর্ণযুগে। আমাদের চোখে দেখা বিটিভিতে তার আস্ফালন এখনও মনে পড়ে। ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের আগে ডাক্তার সাহেব দম্ভ করে বলেছিলেন পঞ্চাশ বছরে ও আওয়ামী লীগ সরকারে আসতে পারবে না।

কোরান শরীফ হাতে নিয়ে গীতা ও উলুধ্বনির ভয় দেখানো বি চৌধুরী শেষ বয়সে এসে যদি অতীতের ভুল বুঝতে পারেন তো ভালো। আর যদি এ হয় হারানো ইমেজ বা সম্মান পুনরুদ্ধার তবে এ খেলার শেষ নাই। এখন তিনি বলেছেন, নির্বাচনে যাবেন। ইলেকশান নিয়ে কয়দিন আগেও তার যে বড় বড় কথা সেগুলো গলে পানি হয়ে গেছে। কারণ কি ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিতাড়ণ বা দূরে সরে যাওয়া? না কী এটাই ছিলো মনে। যে কারণেই হোক বি চৌধুরী বনাম ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টের মধ্যেকার খেলা এখন দেখার বিষয়। এখানেও শেখ হাসিনাই বিজয়ী হলেন।

সংলাপের আরেকটা খবর বড় মজার। স্পষ্টভাষী শেখ হাসিনা যখন খালেদা জিয়াকে পুত্রশোকে দেখতে গিয়ে, ঢুকতে না পারার কথা তুলেছিলেন, তখন তিনি ব্যরিস্টার মওদুদকেও ছেড়ে কথা বলেননি। মিনমিনে গলায় মওদুদ সাহেব যখন দায় এড়াতে বলছিলেন যে, তিনি দোতলায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তখন সাফ সাফ জানিয়ে দেন, দোতলা থেকে কী আমাকে ঢুকতে না দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন? এ কথার জবাব দিতে পারেননি তিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে আদর্শহীন দল বদলানোর মানুষদের এটাই নিয়তি। অথচ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সাথে শেখ হাসিনার কোনও বচসা হয়নি। বরং বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মনে হয়েছে তিনি ছিলেন বিনয়ী এবং ভদ্রজনোচিত। তার এই সৌজন্য মিডিয়ায় সবাই দেখেছেন। নি:সন্দেহে এটা তার ইমেজকে শক্তিশালী করবে।

বলছিলাম সংলাপের কথা। কী লাভ, কী লোকসান তার বিচার করবে সময়। নির্বাচন হোক সবাই অংশগ্রহণ করুক এটাই আমাদের চাওয়া। ড. কামাল হোসেন যে এজেন্ডা নিয়েই মাঠে নামুন না কেন সংলাপে তিনি জয়ী হননি। রাগ এবং ক্রোধ মানুষকে কতটা নিচে নামায় বা কতটা পরাজিত করে সেটা বয়সী মানুষদের অজানা নয়। তারপরও তারা বুঝতে পারেননা। গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, রাগ তোমাকে অন্যের দ্বারা শাস্তি দিক বা না দিক সে নিজেই তোমাকে শাস্তি দিতে যথেষ্ঠ।

আর একটা সত্য এই কাজ যদি থাকে গৌরব নিজ থেকে এসে পায়ে লুটাবে। রাজনীতির কঠিন খেলায় যে জিতুক যে হারুক বাংলাদেশের এই সংলাপ অন্তত সঙ আর আলাপের ফারাক ধরিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে বলেছেন দেশ সবার সেটাই সত্য হোক। সবাই মিলে দেশ ও জনগণের পাশে দাঁড়ালে সংলাপ আলাপে ভালোবাসায় উজ্জ্বল হবে। নয়তো এর কোনও ফলাফল দেখবো বলে মনে হয়না।

এদেশ বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার রক্তের ধারায় ভাসা দেশ। কত জেনারেল, কত সেনা অফিসার, কত সাধারণ মানুষ জান দিয়েছেন দেশের জন্য। সব কি মিথ্যা? ঘনঘন দলমত, চেহারা পাল্টানো নেতারা নিজেদের মতো করে ইতিহাস বদলান। তাতে এদেশ ও মাটির কিছু আসে যায় না। মানুষেরও কিছু আসে যায় না। এটাই বাংলাদেশ। যার শক্তির উৎস জয় বাংলা, যার আঁধার দেশপ্রেম।

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ