Foto

শেয়ার ধারণের ভুল তথ্যে ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা


কোন শ্রেণির বিনিয়োগকারীর হাতে কতটা শেয়ার রয়েছে, প্রতি মাসের শেষে তা পাঁচ ক্যাটাগরিতে প্রকাশ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি। তবে এ তথ্য নির্ভুল কি-না, সে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি খোদ কোম্পানিগুলো। এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জও সে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। যদিও মাসের শুরুতে কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রকাশ করছে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ। অন্ধের মতো এসব তথ্য বিশ্বাস করে বিনিয়োগ করে ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।


অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা কতটুকু, সে তথ্য যাচাই করতে গত নভেম্বরে বিদেশিদের শেয়ার কমায় শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজকে কেস স্টাডি ধরে অনুসন্ধান করে । উভয় ক্ষেত্রে ভুল তথ্য প্রদানের প্রমাণ মিলেছে। এমন ভুল অন্য সব কোম্পানির ক্ষেত্রেও হচ্ছে।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে স্কয়ার ফার্মার দায় পাওয়া যায়নি। কারণ কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের তালিকা সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য পেয়ে থাকে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সব বিনিয়োগকারীর শেয়ারে তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল থেকে। এ প্রতিষ্ঠানই কোম্পানিগুলোকে অসম্পূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। আবার সিডিবিএল অসম্পূর্ণ তথ্য দিচ্ছে, কারণ সব বিনিয়োগকারীর কে কোন ক্যাটাগরির, তা জানার কোনো প্রক্রিয়াই বর্তমান ব্যবস্থায় নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের কে কোন শ্রেণির, সে বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য যথাযথ না হওয়াতে যেমন অধিকাংশ কোম্পানি অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিচ্ছে, তেমনি অসৎ উদ্দেশ্যে; বিশেষত শেয়ারদরকে প্রভাবিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রদান বা তথ্য গোপনেরও প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে।

কেস স্টাডি : স্কয়ার ফার্মা গত ডিসেম্বরের শুরুতে জানিয়েছিল, নভেম্বরে কোম্পানিটি থেকে বিদেশিদের ধারণ করা শেয়ার কমেছিল মোট শেয়ারের ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ, শেয়ার সংখ্যায় যা প্রায় দুই কোটি চার লাখ। এর অর্থ বিদেশিরা ওই মাসে অন্তত এ পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। টাকার অঙ্কে যার বাজারমূল্য ছিল অন্তত ৪৫০ কোটি টাকা। বিদেশিদের এত বিপুল অঙ্কের শেয়ার বিক্রির তথ্য জেনে দেশের যে কোনো বিনিয়োগকারীর দরপতনের ভয়ে শেয়ার বিক্রি করার কথা। তবে কেউ যদি এমনটি করে থাকেন, তিনি ভুল করেছেন। কারণ আদতে এতটা শেয়ার বিক্রি হয়নি। ওই মাসে বিদেশিরা চারটি ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে স্কয়ার ফার্মার মোট ১৯ লাখ শেয়ার কিনেছিলেন। বিপরীতে বিক্রি করেছিলেন ২১ লাখ শেয়ার। এর মানে, তারা নিট মাত্র দুই লাখ শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। অর্থাৎ কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মোটের ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ নয়; প্রকৃতপক্ষে নভেম্বরে এ কোম্পানি থেকে বিদেশিদের শেয়ার কমেছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০২৬ শতাংশ।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ওই নভেম্বরেই বস্ত্র খাতের কোম্পানি তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বেড়েছিল এক কোটি ৩০ লাখ, যা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এই শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল অন্তত ২৫ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির তথ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে যদি কোনো সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনে থাকেন, তবে তিনিও ভুল করেছেন। কারণ আদতে নভেম্বরে এ কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বেড়েছিল মাত্র এক লাখ ৮৩ হাজার, যা মোটের মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ, যার বাজারমূল্য ছিল সর্বোচ্চ ৪৮ লাখ টাকা।

দায় কার : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের যে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে তথ্য দিতে হয় সেগুলো হলো- সংশ্নিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালক, সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারী। শেয়ারহোল্ডারদের শ্রেণিবিভাগের এ তথ্য কোম্পানির নিজের কাছে থাকে না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে শেয়ার ধারণের তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল থেকে কোম্পানিগুলো এ তথ্য নেয়। কিন্তু সিডিবিএল শেয়ারহোল্ডারদের মাত্র তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে তথ্য সংরক্ষণ করে। এগুলো হলো- সাধারণ বিনিয়োগকারী, প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী বাংলাদেশি। স্কয়ার ফার্মা বা অন্য সব কোম্পানি এ তিন শ্রেণির বিনিয়োগকারীর তথ্যকে পৃথক পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে সে তথ্য দিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জকে।

স্কয়ার ফার্মার কোম্পানি সচিব খন্দকার হাবিবুজ্জামান জানান, এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা হচ্ছে হিউম্যান এরর (মানবিক ভুল)। তিনি বলেন, সিডিবিএল থেকে শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য নিয়ে ম্যানুয়ালি সর্টিং (হাতে-কলমে ভাগ) করতে গিয়ে ভুল হতে পারে। কোম্পানি শুধু উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ারের সঠিক তথ্য জানে। এর বাইরে শেয়ারহোল্ডারদের কে কোন ক্যাটাগরির, তা জানার উপায় নেই। এতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে বিধায় সিডিবিএলকে পৃথক পাঁচ ক্যাটাগরিতে তথ্য দিতে বহুবার অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। এই ভুল প্রতিটি কোম্পানির ক্ষেত্রেই হওয়ার অবকাশ আছে এবং হচ্ছেও।

তবে স্কয়ার ফার্মার ভুল আর তসরিফার ভুল এক নয়। জানা গেছে, নর্দার্ন করপোরেশন নামে একটি কোম্পানি তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের এক কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার শেয়ারের মালিক, শতাংশের হিসাবে যা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০১৫ সালের আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজারে আসার পর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নর্দার্ন করপোরেশনকে তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের হিসেবে দেখিয়েছে। কিন্তু নভেম্বর থেকে এটিকে উদ্যোক্তা তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই শেয়ার ধারণে এমন পরিবর্তন এসেছে। এর অর্থ, নভেম্বরে তসরিফার প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্য সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ওই মাসে শেয়ার সংখ্যার হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বেড়েছে এক লাখ ৮৩ হাজার বা শতাংশের হারে মোট শেয়ারের মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ।

এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিম হাসান জানান, ভুল করে নর্দার্ন করপোরেশনকে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। ডিএসইর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংঘ স্মারকে নর্দার্ন করপোরেশনের নাম না থাকায় নভেম্বরে তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোক্তা তালিকা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিন বছর আগে তালিকাভুক্তি প্রবিধানমালা সংশোধনের পর উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের তথ্য সঠিকভাবে হিসাব করতে সব কোম্পানিকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এতদিন পর এমন সংশোধনের দায় কোম্পানির। এটা ইচ্ছাকৃতও হতে পারে।

শেয়ারবাজারের দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারদরকে প্রভাবিত করতে শেয়ার ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃত ও ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। এর বড় উদাহরণ মিলেছে পাট খাতের কোম্পানি নর্দার্ন জুট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে। কোম্পানিটির ৩০ শতাংশের মালিকানা ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি)। ২০১৭ সালের আগস্টে আইডিবি পুরো শেয়ার একটি বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু নর্দার্ন টানা ছয় মাস এ তথ্য গোপন রাখে। ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটি স্টক এক্সচেঞ্জকে জানায়, পর্ষদ সদস্যপদ (পরিচালক) থেকে আইডিবি নিজে থেকে সরে গেছে। এর পরই শেয়ার ধারণের তথ্যে পরিবর্তন আনে।

শুধু তাই নয়, বেসরকারি খাতের কোম্পানি সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স এবং ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিতে সরকারের কোনো শেয়ার নেই। অথচ সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স প্রতি মাসেই জানাচ্ছে, এ কোম্পানির মোট শেয়ারের প্রায় ১১ শতাংশের মালিক সরকার। ন্যাশনাল হাউজিংও জানাচ্ছে, কোম্পানিটির ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশের মালিক সরকার। এ ছাড়া সোনারগাঁও টেক্সটাইল ও আলহাজ্ব টেক্সটাইলও জানাচ্ছে, কোম্পানি দুটিতে সরকারের শেয়ার রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিগুলো যে শেয়ারকে সরকারি বলে দাবি করছে, তা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি বা সাধারণ বীমা বা জীবন বীমা কোম্পানির। তালিকাভুক্ত আরও অনেক কোম্পানিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসব কোম্পানির শেয়ার রয়েছে এবং সে শেয়ার সরকারি শেয়ার হিসাবে দেখানো হয় না। এ বিষয়ে গত বছরের ১৮ এপ্রিল একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছিল।

সংশ্নিষ্টদের জবাব : জানতে চাইলে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজেদুর রহমান জানান, বিনিয়োগকারীদের কোনো তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে থাকে না। ফলে শেয়ার ধারণের কোনো তথ্যে ভুল আছে কি-না, তা জানার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি যে তথ্য দেয়, তার ওপরেই আস্থা রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে সিডিবিএলই কিছু করতে পারে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারকে কোন শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা এখন পর্যন্ত করা হয়নি।

সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভ্র কান্তি চৌধুরী বলেন, ২০০০ সালে সিডিবিএল প্রতিষ্ঠার পর বিও অ্যাকাউন্ট ফরমের মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা প্রবাসী বাংলাদেশি কি-না, সে তথ্য নেওয়া হয়েছে। ফলে এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কোনো তথ্য নেই। সময়ের প্রয়োজনে নতুন যেসব ক্যাটাগরি করার প্রয়োজন পড়ছে, আগামীতে বিও অ্যাকাউন্ট ফরমে পরিবর্তন এনে সেসব ক্যাটাগরি যুক্ত করা হবে। এরই মধ্যে যাদের অ্যাকাউন্ট হয়েছে, তাদের তথ্যও হালনাগাদ করা হবে। তবে এ পরিবর্তন রাতারাতি হবে না।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান জানান, শেয়ার ধারণের তথ্যের ভুল বিষয়ে বিএসইসি অবহিত নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ