Foto

শিল্পীরা কী টাকায় কেনা গোলাম?


কথা ছিলো দেড় ঘণ্টা গান গাইবেন। সময় বাড়িয়ে গেয়েছেন পৌনে দুই ঘণ্টারও বেশি। তার পরও আয়োজকদের মন ভরেনি। গাইতে বলছিলেন আরও। না করাতেই চটলেন আয়োজক কমিটি।


গত রবিবার সেখানে গান শেষ করে মঞ্চ থেকে নামার পরেই কর্মকর্তাদের হাতে চরম লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে অভিযোগ সঙ্গীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তীর। ফেসবুকে লাইভে সেই হেনস্থার কথা বিস্তারে বর্ণনাও করেছেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন শিল্পীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিয়ে।

এ ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ কৃষ্ণনাগরিক। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।তবে আয়োজক সংস্থা ’কৃষ্ণনগর সাংস্কৃতিক মঞ্চ’ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইমন দাবি করেছেন, রবিবার মঞ্চ থেকে নামার পরে কর্মকর্তারা তাঁর গাড়ি আটকে দেন। তাঁকে গালিগালাজ করে মাঠের গেটে তালা দিয়ে দেওয়া হয়। তুইতোকারি করে তাকে আরও কিছু গান গাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং কথা না শুনলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বাদ্যযন্ত্র শিল্পীদের ধাক্কাও দেওয়া হয়। শিল্পী ও তার সহযোগীদের এই ভাবে লাঞ্ছিত হতে দেখে শেষ পর্যন্ত জনতা গেট ভেঙে তাদের উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে দেন।

ইমন জানান, শিল্পীদের টাকা দিয়েছেন বলে কিছু মানুষ তাদের কেনা গোলাম বলে মনে করেন।’’ আরও বলেন, ’’যে ভাবে আমাদের অপমান ও হেনস্থা করা হয়েছে ভাবা যায় না। দর্শকেরা এগিয়ে এসে আমাদের সাহায্য না করলে চরম বিপদ হত।

শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। আয়োজক মঞ্চের সম্পাদক অনন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তবে ইমনের সঙ্গে এমন আচরণে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন কলকাতার সঙ্গীত জগতের মানুষেরা। কলকাতার সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র বলেন,অত্যন্ত ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা। আমি ইমনের ফেসবুক লাইভটা দেখছিলাম। দেখতে-দেখতে একটা কথাই আমার মনে হচ্ছিল। রাজনৈতিক বাতাবরণটাই এখন এই ধরনের হয়ে গিয়েছে। শিল্পীদের প্রশাসনিক ভাবে নিরাপত্তা দিতে আমরা ব্যর্থ। আর একটা প্রশ্ন— তা হলে আর গানবাজনা করে কী হল? গানবাজনা তো শিল্পীরা করে থাকেন একটা সুস্থ মানসিকতা তৈরি করার লক্ষ্যে। সেটাই তো তৈরি হচ্ছে না! শিল্পীকে এই ভাবে অপমান করা হচ্ছে! আমাদের প্রত্যেক শিল্পীর উচিত, এর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করা। প্রয়োজনে ছয় মাস আমরা আর গাইতেই যাব না। জানি, সেটা পেশাগত ভাবে অনেক সময়ে সম্ভব হয় না। কিন্তু শিল্পীদের একজোট হতেই হবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

ইমনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরী। তিনি বলেন,এটা আমার সঙ্গে বা ইমনের সঙ্গে ঘটেছে বলে নয়, অনেক শিল্পীদের সঙ্গেই ঘটে। সকলে মুখ খোলেন না, ভয় পান, অকারণ ঝামেলায় যেতে চান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিল্পীদের অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এমন নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। আমার মনে হয়— ’ইটস হাই টাইম’। প্রতিবাদ করতেই হবে। এখন চুপ করে থাকার সময় নয়। আর একটা বিষয়। আমার ক্ষেত্রেই যেমন দেখেছি, পুলিশ এগিয়ে এসে আমাদের উদ্ধার করেছিল, ইমনের ক্ষেত্রেও কৃষ্ণনগরের সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছেন সাহায্য করতে। ভাল মানুষ এখনও আছেন। তাই কিছু খারাপ মানুষের জন্য ভয় পেলে চলবে না। চেষ্টা করতে হবে, যাতে চারপাশে ভাল মানুষের সংখ্যাটা বাড়ানো যায়।

এমনটা কৃষ্ণনগরে কী করে ঘটল?প্রশ্ন তুলেছেন সঙ্গীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র। তিনি বলেন, রবিবার রাতে ইমনের সঙ্গে যে ঘটনাটা ঘটল, সেটা ভীষণ ’আনলাইক কৃষ্ণনগর’। এর আগে আমি শুনেছি, মেদিনীপুরে বা মালদহে গিয়ে শিল্পীদের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কৃষ্ণনগর তো অন্য রকম একটা জায়গা। এখানকার সংস্কৃতিটাই আলাদা। এর থেকেই বোঝা যায়, যাঁরা অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাঁরা প্রপার কালচার্ড নন। প্রতিবাদে শিল্পীদের এক হওয়া দরকার, যদিও আমাদের শিল্পীদের মধ্যেই একতার ভীষণ অভাব! একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার না করে পারছি না। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়েছি। আয়োজকদের এক জন বললেন, ’’দিদি, জাতীয় সঙ্গীতের মতো ওই গানটা গাইবেন।’’ আমি বললাম, ’’কোনটা? বন্দেমাতরম্?’’ তিনি হাসি মুখে সম্মতি জানালেন। এই তো আমাদের সংস্কৃতির অবস্থা!

Facebook Comments

" বিনোদন " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ