Foto

শত কোটি ডলারের যুদ্ধ


রেমন্ড গ্রুপের নাম শোনেননি—এমন লোক কম। ভারতের এই প্রতিষ্ঠানের পোশাকের খ্যাতি রয়েছে। বাংলাদেশেও রেমন্ড জনপ্রিয়। তবে শত কোটি ডলারের খ্যাতনামা এই প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছে ক্ষমতার যুদ্ধ। তাও নিজেদের লোকের মধ্যে। আরও স্পষ্ট করে বললে বাপ-বেটার মধ্যে। বাবা এখন কপাল চাপড়ে বলছেন, কেন ছেলেকে এত ক্ষমতা দেওয়ার মতো ভুল করলেন! ছেলের কারণে তিনিই নিজে এখন বিলাসবহুল বাড়ি ও বিশাল আকারের প্রতিষ্ঠানছাড়া হতে যাচ্ছেন!


বাপ-বেটার এই দ্বন্দ্বের খবর উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, বিজয়পাত সিংহানিয়া শত কোটি ডলারে পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের সাম্রাজ্য নিজের পরিবারের ভেতরেই রাখবেন বলে ভেবেছিলেন। সেই ভাবনা থেকে তিন বছর আগে উপহার হিসেবে ছেলে গৌতম সিংহানিয়ার হাতে রেমন্ড গ্রুপের কর্তৃত্ব তুলে দেন। তখন থেকে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। এখন বাবা বিজয়পাত সিংহানিয়া মনে করছেন, ছেলে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং তাঁকে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ৮০ বছর বয়সী বিজয়পাতের দাবি, আবেগতাড়িত হয়ে তিনি ওই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।


বিজয়পাত সিংহানিয়া ছোট টেক্সটাইল ব্যবসা থেকে আজ ধনকুবের হয়েছেন। রেমন্ড গ্রুপকে এখন বলা হয় পশমি সুতার স্যুট উৎপাদনের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপের সিমেন্ট, ডেইরি ও প্রযুক্তি বাণিজ্যও রয়েছে।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ক্রেডিট সুসির প্রতিবেদন অনুসারে, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পারিবারিক বাণিজ্যের দিকে দিয়ে বিশ্বে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত।

তবে পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সুষ্ঠু বণ্টন ও নতুন প্রজন্মের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার ব্যাপারে কিছু বিশ্লেষকের মত হচ্ছে, ভারতে এ ধরনের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আরও সুশাসন নিশ্চিতের জন্য বৈশ্বিক করপোরেট মান প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

ভারতের আরেক আলোচিত ধনী আম্বানি পরিবারেও এমন যুদ্ধ হয়েছে। কোনো একটি মান নির্ধারণ করা থাকলে এ ধরনের লড়াই রোধ করা সম্ভব। বর্তমানে এশিয়ার সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি। বাবা ধিরুভাইয়ের মৃত্যুর পর রিলায়েন্স গ্রুপ নিয়ে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে তাঁর ভাই অনিলের বছরের পর বছর ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।

ভারতের আরেক শিল্পপতি ওয়েভ গ্রুপের মালিক পন্টি চাধাকে তাঁর ভাই হারদিপ সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ২০১২ সালে গুলি করে হত্যা করেন।

পারিবারিক ওষুধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান র‌্যানবেক্সি ও রেলিগের নিয়ে ধনকুবের দুই ভাই শিবেন্দর সিং ও মালবিন্দর সিংয়ের মধ্যেও লড়াইয়ের অভিযোগ রয়েছে।

রেমন্ড গ্রুপ নিয়ে বাপ-বেটার যুদ্ধের সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালে ছেলে গৌতমের হাতে বাবা বিজয়পাত প্রতিষ্ঠানের ৩৭ শতাংশ অংশীদারত্ব তুলে দেওয়ার পর।

বিজয়পাত জানান, চুক্তি অনুসারে তিনি মুম্বাইয়ের মালাবার হিল এলাকায় সিংহানিয়া পরিবারের ৩৬ তলার জে কে হাউসের একটি অ্যাপার্টমেন্ট পান। বাজারের দরের চেয়ে বেশ কম দাম ধরা হয় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টটির। গৌতম রেমন্ড বোর্ডকে পরামর্শ দেন যে অ্যাপার্টমেন্টটিকে যেন প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি হিসেবে ধরা হয়।

বিরোধ চরমে ওঠে তখন, যখন বোর্ড এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি অশালীন মন্তব্যের অভিযোগ তুলে বিজয়পাতের ‘চেয়ারম্যান ইমেরিটাস’ খেতাব নিয়ে নেয়। বিজয়পাত অভিযোগ করেন, তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর পদ এবং তাঁকে দেওয়া ভারত সরকারের শীর্ষ উপাধি ‘পদ্মভূষণ’ চুরি করে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, দুই বছর ধরে ছেলের সঙ্গে তিনি কথা বলেন না। এখন ছেলের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চিন্তা করছেন। বাবা-মায়ের মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে ২০০৭ সালের ভারতের এক আইন অনুসারে ওই বাবা-মা সন্তানদের উপহার হিসেবে দেওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে নিতে পারেন। বিজয়পাত সেই আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছেন।

৯৩ বছরের পুরোনো রেমন্ড গ্রুপকে ছেলে গৌতমের হাতে তুলে দেওয়াকে ‘চরম নির্বুদ্ধিতা’ বলে মন্তব্য করেছেন বিজয়পাত সিংহানিয়া।

বিজয়পাত আরও বলেন, জীবদ্দশায় কোনো বাবা-মা তাঁর সম্বল যেন কখনো সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ভুল না করেন।

তবে গৌতম বলেছেন, তিনি শুধু তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সঠিক কাজ করেছেন। রেমন্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছেলে হিসেবে তাঁর দায়িত্বের চেয়ে আলাদা। তাঁর বাবা বিজয়পাত বোর্ডের সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভুক্তভোগী। আমি কি কোনো ভুল করেছি? বাবার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পুরো খেলাই পাল্টে গেছে। প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানোর জন্য আমি এখন অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যা আগে পারতাম না।’

তবে বাপ-বেটার এই লড়াইয়ের আপাতদৃষ্টিতে কোনো প্রভাব পড়েনি রেমন্ড গ্রুপে। ২০১৮ সালে প্রথম আট মাসে ৫০ শতাংশ লাভ বেড়েছে প্রতিষ্ঠানের। রেমন্ড গ্রুপ সম্প্রতি ইথিওপিয়াতে একটি বড় কারখানা খুলেছে। ৫৫টিরও বেশি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ