Foto

রোহিঙ্গা সংকট: দুই উপজেলায় মজুরি ক্ষতি ১৮২ কোটি টাকা


রোহিঙ্গাদের কারণে গত এক বছরে টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় কৃষি ও অকৃষি খাতে দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি বাবদ ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া বনভূমি, শস্য উৎপাদন, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এবং ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ চিত্র। এদিকে খুব শিগগির রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।


তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা খুব শিগগির মিয়ানমারে ফিরতে শুরু করলেও এ দেশ ছাড়তে ৪-৫ বছর সময় লাগবে। কিছু দেরিতে ফেরা শুরু করলে ২০৩০ সালের আগে সবার মিয়ানমারে ফেরা সম্ভব হবে না।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ’ইমপ্যাক্ট অব দ্য রোহিঙ্গা রিফিউজি ইনফ্ল্যাক্স অন হোস্ট কমিউনিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক কর্মশালার আয়োজন করে পিআরআই। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তারের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি।

আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিআর আবরার এবং রিসার্স ইনেশিয়েটিভস, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনাগুহ ঠাকুরতা। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. এমএ রাজ্জাক।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

তাছাড়া রোহিঙ্গারা আসার আগের তুলনায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সব ধরনের দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিকদের মজুরি হার কমে গেছে। এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, টেকনাফে আগে যাদের দৈনিক মজুরি ছিল ৪১৭ টাকা তারা পরবর্তী সময়ে পায় ৩৫৭ টাকা।

এ ক্ষেত্রে মজুরি কমেছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। উখিয়ায় আগে মজুরি ছিল ৪৫০ টাকা। এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৪২৩ টাকায়। এ ক্ষেত্রে মজুরি কমেছে ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ।

এদিকে রোহিঙ্গা আসার আগে টেকনাফে শুধু কৃষি শ্রমিকদের মজুরি ছিল দৈনিক ৪২৩ টাকা। এখন সেটি কমে হয়েছে ৩৭৫ টাকা। অর্থাৎ মজুরি কমেছে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ। উখিয়ায় কৃষি মজুরি আগে ছিল ৪৮৪ টাকা। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪শ’ টাকা।
এ ক্ষেত্রে মজুরি কমেছে ১৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে কক্সবাজার উপজেলায়। এ ক্ষেত্রে মজুরি হার বেড়েছে। সব ধরনের শ্রমিকের ক্ষেত্রে আগে মজুরি ছিল ৪শ’ টাকা। এখন হয়েছে ৪১৭ টাকা। অর্থাৎ ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি শ্রমিক আগে ছিল ৩৭৫ টাকা এখন বেড়ে হয়েছে ৪শ’ টাকা। এ ক্ষেত্রে বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় অধিবাসীদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ঢলের কারণে সাড়ে ৫ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। যার মূল্য হতে পারে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি ডলার। দেড় হাজার হেক্টর বনভূমির বণ্যপ্রাণী ধ্বংস হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতিদিন ৫ বিলিয়ন লিটার বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হচ্ছে। এ চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেননা নদী এবং নালাগুলো দূষিত হয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজারের বিভিন্ন অবকাঠামো বিশেষ করে রাস্তার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় স্কুল, হাসপাতাল স্থানীয় জনসেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় কক্সবাজারে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্রব্য সহায়তা না দিয়ে রোহিঙ্গাদের নগদ অর্থ সহায়তা দেয়ার সুপারিশ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যদি ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়া হয় তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে তা ২ বিলিয়ন ডলারের প্রভাব সৃষ্টি করবে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবদুল মোমেন বলেন, আমরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
আশা করছি, শিগগির রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা সংঘাত চাই না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে।

কেননা রোহিঙ্গা সংকট তৈরি করেছে মিয়ানমার আর সমাধানও করতে হবে তাদের। চীন এবং জাপানের অনেক বিনিয়োগ আছে মিয়ানমারে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তারাও এগিয়ে আসবে বলে আশা করি। তা না হলে তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে এ সংকট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগে চীনে গেছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু আমাদের দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যও সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করছি।
ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যাপক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। সুদীপ্ত মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করেছে এটা অবশ্যই প্রশংসার।

বাংলাদেশের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমার ঘরটা ছোট কিন্তু মনটা বড়। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আমরা সবাই মিলে কাজ করে যাচ্ছি।

ড. সিআর আবরার বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে। মেঘনাগুহ ঠাকুরতা বলেন, নারী ও শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তারা পাচারের শিকার হচ্ছে।

Facebook Comments

" প্রতিবেশী " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ