Foto

রফতানি হয়নি অথচ ডলার এসেছে


চিংড়ি রফতানি করবেন বলে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে দুই লাখ ৬৮ হাজার ডলার আগাম নেন খুলনার এক ব্যবসায়ী। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগামের বিপরীতে পণ্য রফতানি করেছেন মাত্র ৩৮ হাজার ডলারের। বিদেশ থেকে আনা বেশিরভাগ টাকা নগদে তুলে কোথায় খরচ করেছেন তার হদিস নেই। ২০১২ ও ২০১৩ সালের এ ঘটনা ধরা পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে।


এদিকে দীর্ঘদিন পণ্য না পেলেও বিদেশি ক্রেতার পক্ষ থেকেও অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনো তোড়জোড় নেই। আমদানিকারকের ব্যাংকও নিশ্চুপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল ধারণা করছে, রফতানির নামে অন্য কোনো কাজে এ অর্থ আনা হয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর নাম খন্দকার আইনুল ইসলাম। তিনি খুলনার সাউথফিল্ড ফিশারিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কয়েক দফায় চিংড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। চিংড়ি শিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণে ২০১৫ সালে তিনি সরকার গঠিত বোর্ডে মালিকপক্ষের সদস্য প্রতিনিধিও ছিলেন। একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা অফিস থেকে সম্প্রতি পরিদর্শনটি পরিচালিত হয়। রফতানির অর্থ না পেয়েও বিদেশি আমদানিকারকের নীরবতাসহ সার্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে এ ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে।

অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার আইনুল ইসলাম টেলিফোনে সমকালকে বলেন, যে টাকা এসেছে তার মধ্যে আট থেকে নয় হাজার ডলার ছাড়া বাকি সব পণ্য গেছে। মাত্র ৩৮ হাজার ডলারের পণ্য পাঠানোর বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের কাছে ডকুমেন্ট চেয়েছিল। তিনি অগ্রণী ব্যাংককে তা সরবরাহ করেন। এখন ব্যাংক কী পাঠাচ্ছে তা তিনি জানেন না। অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে ৩৮ হাজার ডলারের পণ্য পাঠানোর তথ্য দিয়েছে, বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিত আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) দেওয়ার কথা বলেছেন। ব্যাংক তাকে অসহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ করেন এ ব্যবসায়ী।

জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা তিনি যথাসময়ে ফেরত না দেওয়ায় বেশ আগে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে নিজেরও কিছু টাকা-পয়সা থাকতে হয়। তার হয়তো সেভাবে টাকা নেই। তিনি ঋণ পুনঃতফসিল করতে চেয়ে পরে আর আসেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানি প্রতিষ্ঠান মার কোম্পানি লিমিটেডের আদেশের বিপরীতে অগ্রিম টিটির মাধ্যমে এক লাখ ৩৬ হাজার ৮০ ডলার দেশে আনেন আইনুল ইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ জুন অগ্রণী ব্যাংকের খুলনার স্যার ইকবাল রোড শাখায় এ অর্থ জমা হয়। এর পরদিন আইনুল ইসলামের তারিখ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিলবিহীন এক আবেদনের ভিত্তিতে ৮৮ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৪ টাকা একটি চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। তার একদিন পর পুরো টাকা নগদে তুলে নেন আইনুল। ২০১৩ সালের ২ জুন ইউক্রেনের প্রতিষ্ঠান পিপি টিডি ইউক্রেইনিসকা রিবনার আদেশে ৬৩ হাজার ১৫৩ ডলার আসে ওই শাখায়। ওই দিনই আইনুল ইসলামের আবেদনে ৪৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা একটি চলতি হিসাবে স্থানান্তর করে ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। তবে এর বিপরীতে আজ অবধি কোনো রফতানি হয়নি। আবার অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য কোনো তাগাদা নেই প্রতিষ্ঠানটির।

দুই প্রতিষ্ঠান ছাড়াও পর্তুগালের আলবিনো লিওনেল এলডিএ থেকে ১৯ হাজার ৪৩৬ ডলার, ফ্রান্সের ইটিসি সারল থেকে ২৩ হাজার ৪৭৩ ডলার এবং পোলান্ডের পেসকাডেরো স্পোলকা জেড অগরানাইসজোনা থেকে ২৪ হাজার ৫৬১ ডলার অগ্রিম আনেন আইনুল। এর মধ্যে শুধু জাপানি ব্যবসায়ীর কাছে ৩৭ হাজার ৮৭৫ ডলার সমমূল্যের পণ্য রফতানি দেখিয়েছেন। বাকি অর্থের বেশিরভাগই নগদে তুলে নিয়ে ব্যয় করেছেন। তবে এসব অগ্রিম টিটির বিপরীতে আমদানিকারকের কোনো ক্রয়াদেশ বা প্রোফর্মা ইনভয়েস দেখাতে পারেননি। এমনকি এতদিন পণ্য না পাওয়ার পরও আমদানিকারক বা রেমিটিং ব্যাংক আজ অবধি যোগাযোগ করেনি। অবশ্য আইনুলের পক্ষ থেকে আমদানিকারকের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে চিঠি চালাচালির কিছু নথি পরিদর্শন দলকে দেওয়া হয়েছে। তবে যোগাযোগের পক্ষে যেসব কাগজপত্র তিনি দিয়েছেন তার সবই ভুয়া এবং অসঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পরিদর্শক দল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল বলছে, পাঁচ বছরের বেশি অতিবাহিত হওয়ার পরও সাউথফিল্ড ফিশারিজ রফতানি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। অগ্রিম মূল্য গ্রহণের পর রফতানি না করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রফতানিকারকের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। বিষয়টি সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের তদারক করার নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। আর রফতানিকারক উভয়পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করেছে। ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের পর তা কোন খাতে কীভাবে খরচ করেছে সে বিষয়ে একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও আইনুল ইসলাম কোনো তথ্য পরিদর্শক দলের কাছে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমদানিকারকের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তা দেশীয় কর্তৃপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো হতে পারে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে।

আইনুল ইসলাম আরও বলেন, সব ধরনের নিয়ম মেনে বাইরে থেকে টাকা এসেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে বেশ কিছুদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টাকা পাঠিয়েও যোগাযোগ না করার কারণ জানতে চাইলে বলেন, এটা ঠিক নয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এর পক্ষে সব কাগজপত্র তিনি অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে পরিদর্শক দলকে দিয়েছেন। যেসব কাগজ তিনি সরবরাহ করেছেন তার সবই সঠিক।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ