Foto

যে কারণে সরে যেতে হলো দুই স্বৈরশাসককে


চলতি মাসে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই স্বৈরাচারী একনায়কের পতন হয়েছে। তাঁরা হলেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা ও সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। দুজনেই নিজের দেশে প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করে আসছিলেন। অথচ হুট করেই জনবিক্ষোভের মুখে ও সেনাবাহিনীর চাপে তাঁদের গদি হারাতে হলো। কিন্তু শুধু কি জনবিক্ষোভ ও সেনাবাহিনীই এসব স্বৈরাচারী শাসকের পতনের কারণ?


গবেষকেরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী একনায়কদের পতনের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় কারণ হিসেবে কাজ করে। ক্যু ও বিপ্লব—বিশ্বরাজনীতিতে এই দুটি বিষয় বেশ দুর্লভ। ক্যু ও বিপ্লব কখনোই বলেকয়ে আসে না, অকস্মাৎ ঘটে। তবে এগুলো ঘটার আশঙ্কা আঁচ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচার (ওইএফ) গবেষণা করে ক্যু সংঘটনের বা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ধারণাগত একটি মডেল তৈরি করেছে। এই মডেলের নাম দেওয়া হয়েছে "ক্যুকাস্ট"। এই মডেল অনুযায়ী ক্যু সংঘটনের কিছু অনুঘটক আছে। এগুলো হলো: ক্যুর ঝুঁকিতে থাকা কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, কোনো একনায়ক কত দিন ধরে শাসনক্ষমতায় আছেন, ওই দেশে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ক্যু হয়েছে কি না বা হলে কবে হয়েছে এবং সম্প্রতি ওই দেশ বন্যা বা দুর্ভিক্ষের মতো কোনো দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে কি না।

আলজেরিয়ায় প্রবল জনবিক্ষোভের মুখে সরে দাঁড়ান বুতেফ্লিকা। অন্যদিকে সুদানে সেনাবাহিনী সরিয়ে দিয়েছে ওমর আল-বশিরকে। ওই দুজনের বিরুদ্ধেই দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত পাঁচ বছর ধরে আলজেরিয়ার বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হলো ২ দশমিক ৮ শতাংশ। এই সময়ে পুরো পুরো আফ্রিকায় গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আর একই সময়ে সুদানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস, ২০১৯ সালে সুদানের অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার মধ্যকার সম্পর্ক বেশ জটিল। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যে আরব বসন্ত সংঘটিত হয়েছিল, তার পেছনের কারণ শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়। ওই সময়ের আগ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং এই উন্নতির হার বেশ ধারাবাহিক। এই দুই অঞ্চলে অতি দারিদ্র্য ও আয়–বৈষম্যও ক্রমান্বয়ে কমছে।

তাহলে ঘাপলা কোথায়? ২০০০ সালের পর হওয়া বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আরব অঞ্চলের অধিবাসীরা তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষের আয় বাড়ছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত ৪০ শতাংশ মানুষের জীবনমানের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি শ্রেণির মানুষ লাভবান হলেও আরেকটি শ্রেণি বঞ্চিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষিত বেকারের উচ্চ হার। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় শিক্ষিত স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ ছিল বেকার। অথচ পুরো জনসংখ্যায় এর হার ছিল মোটে ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বিক্ষোভ সৃষ্টির ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের চেয়ে সুযোগের অভাব বেশি ভূমিকা রাখে।

আবার ক্যু সংঘটনের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কোনো দেশে যত বেশি ক্যু সংঘটনের নজির আছে, সেই দেশে এমন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কাও বেশি থাকে। বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচারের (ওইএফ) তৈরি "ক্যুকাস্ট" মডেল অনুযায়ী, যেসব রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসন লম্বা সময় ধরে চলছে, সেসব দেশে ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আবার যেসব দেশে কিছুদিন হলো স্বৈরাচারী শাসন শুরু হয়েছে, সেসব দেশেও পাল্টা ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সদ্য প্রতিষ্ঠিত একনায়ক শাসকের সময় প্রয়োজন হয়। আবার বুতেফ্লিকা বা বশিরের মতো যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শাসনক্ষমতা দখল করে থাকেন, তাঁদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় বয়স। বয়স যত বাড়ে, জনমনে তাঁদের আবেদন তত কমতে থাকে।

ওওইএফের কর্মকর্তা ক্লেটন বিসো বলেন, বিশ্বব্যাপী একনায়কেরা এখন নির্বাচন ঠেকিয়ে রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। নির্বাচনে জিতে তাঁরা নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধ করার সুযোগ পান। কিন্তু নির্বাচনে হেরেও যখন তাঁরা জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান, তখনই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

একনায়কের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অন্যতম অস্ত্র হলো সেনাবাহিনী। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে ক্ষমতা দখলের উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে ঢের পাওয়া যায়। থাইল্যান্ডে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র শাসনের অবসানের পর আজ পর্যন্ত মোট ১৯টি ক্যু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সর্বশেষ ২০১৪ সালে থাইল্যান্ডে ক্যু হয়। এখন সংবিধান বদলে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চাইছে থাই সেনাবাহিনী। মিয়ানমারে ২০১৫ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ক্ষমতা যায় বেসামরিক সরকারের হাতে। তবে সেখানকার সরকার কাঠামোতে এখনো সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পার্লামেন্টেও তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। বেসামরিক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ও নিয়ন্ত্রণ করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ওদিকে পাকিস্তানে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরাসরি সামরিক শাসন বলবৎ ছিল। যদিও ইমরান খানের নেতৃত্বে এখন পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার কাজ করছে, কিন্তু বলা হয়ে থাকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে সেনাবাহিনী। সরকারি কাজে জড়িত থাকার পাশাপাশি একই সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করে থাকে এসব দেশের সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনীর মধ্যে "অর্থনৈতিক স্বার্থ" তৈরি করা এবং তা টিকিয়ে রাখা একনায়কের অন্যতম কৌশল। এর মাধ্যমেই স্বৈরাচারী শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতার ভিত মজবুত রাখতে চান। ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার গবেষক জোনাথন পাওয়েল বলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যে নগদ অর্থের বন্যা বইয়ে দিয়ে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে রাখতে চায় একনায়কেরা। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডও ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে ক্যু সংঘটনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানো না যায়।

তারপরও অবশ্য সেনাবাহিনীর চাপেই সরে যেতে হয়েছে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে। কিন্তু বশির সরে যাওয়ার পরও রাস্তা থেকে বিক্ষোভরত মানুষ সরছে না। কারণ, বশিরের বিদায়ের পরও স্থিতিশীল হতে পারেনি সুদান। উল্টো একের পর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব একনায়ক মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একেক ব্যক্তিকে সরকারের উচ্চাসনে বসান। এসবের মূলে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ ও নগদ অর্থ পাওয়ার লোভ। ফলে ক্যুর ফলে সৃষ্ট সংকটজনক পরিস্থিতিতে পুরো সরকার কাঠামোতেই ধস নামে। কিন্তু বিক্ষোভরত জনতা বশিরের মতো একনায়ককে বিদায় করতে পারলেও তাঁর তৈরি স্বৈরাচারী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারে না। ফলে, বুতেফ্লিকা বা বশিরেরা সরে গেলেও, ফের নতুন একনায়ক সৃষ্টি হয় এসব দেশে। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এসবের পেছনে সমর্থন জোগায় প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোও। যেমনটা সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত করছে ইয়েমেনে ও সুদানে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের একটি দুষ্টচক্র এসব দেশে চলতেই থাকে। এভাবেই তৈরি হতে থাকে একনায়ক। স্বৈরাচারী শাসনে থাকা এই দেশগুলোর জনগণ তখন "ফাঁদে" আটকে পড়ে। "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু..." —এই প্রবাদ সেখানে অচল। কারণ, বিশ্বাস করে কারও হাতে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা তুলে দিয়ে স্বস্তি মেলে না তাদের।

 

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ