Foto

মিয়ানমারে সরকার ও সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব


গণহত্যাসহ নানা ইস্যুতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবশেষে জান্তা সরকারের আমলে প্রণীত সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। গতকাল মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধন বিষয়ে দেশটির ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) আনীত একটি প্রস্তাব পার্লামেন্টে গৃহীত হয়েছে।


তবে সেনাবাহিনী থেকে নির্বাচিত সব এমপি এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তার পরও আগামী শুক্রবার প্রস্তাবটি নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে মিয়ানমারে ফের সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডির একজন এমপি জান্তা সরকারের সময় প্রণীত সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে সংবিধান সংশোধানের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য এমপিদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। পরে প্রস্তাবটি পার্লামেন্টে আলোচনা করা হবে কিনা এ বিষয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সেনাবাহিনীর এমপিদের সবাই দাঁড়িয়ে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এ নিয়ে তুমুল হট্টগোলের মধ্যে স্পিকার ইউ টি খুন মিয়াত সেনাবাহিনীর এমপিদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে পার্লামেন্টকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।

এনএলডি সংবিধানের কোন ধারা সংশোধনের প্রস্তাব আনতে যাচ্ছে তা জানা যায়নি। অবশ্য এর আগে এনএলডি নেতারা সংবিধানের ৫৩৬ ধারা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। এ ধারাতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সেনাবাহিনীর কার্যকর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।

দীর্ঘ সেনাশাসনের অবসানের পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি মিয়ানমারে ক্ষমতায় আসে। তার পরও সু চির সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ ২০০৮ সালে জান্তা সরকার প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী দেশটির পার্লামেন্টের এক চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। এমনকি সরকার বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে সেনা সংখ্যাগরিষ্ঠ এ পরিষদের। এর মধ্যেই ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমারের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রয়া দেখাননি। সেনাবাহিনীকে ক্ষেপাতে চান না বলেই সু চি এসব বিষয়ে নিস্পৃহ আচরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু নতুন করে সংবিধান সংশোধনের এ প্রস্তাব মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে গত সোমবার রাখাইনের রাথেডং শহরতলিতে আবার বৌদ্ধ বিদ্রোহীদের সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রচ- গোলাগুলি হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। সোমবার রেডিও ফ্রি এশিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, দীর্ঘ চার ঘণ্টা গোলাগুলির পর রাথেডংয়ের ওন চাউং গ্রামে সেনা ও সীমান্ত পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন ঘরবাড়িতে ঢুকে তল্লাশি করে। এ সময় তারা ব্যাপক লুটপাট চালায় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

এক গ্রামবাসী জানান, সকাল ৮টার দিকে ছোট ও ভারী অস্ত্র নিয়ে সরকারি বাহিনী পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে। এ সময় তারা ব্যাপক গুলিবর্ষণ করে। আমরা জানি না কেন তারা এভাবে গুলিবর্ষণ করছে। কিছু মানুষ এরই মধ্যে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো পালাতে পারিনি।

এর আগে গত শনিবার রাথেডংয়ের থামি হ্লা গ্রামে ঢুকে ব্যাপক তল্লাশি চালান সেনাসদস্যরা। এ সময় তারা স্থানীয়দের স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ নানা জিনিস লুট করে নিয়ে যান। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ