Foto

মাহমুদউল্লাহরও ঘুরে দাঁড়ানোর টেস্ট


বাংলাদেশ দলের জন্য মিরপুর টেস্ট কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। জয় তো বটেই, নিজেদের সামর্থ্যের বার্তা দিতে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া জয় জরুরি। তবে এই টেস্ট আরও কঠিন পরীক্ষা মাহমুদউল্লাহর জন্য। ফেরার লড়াইয়ে দলকে নেতৃত্ব দেওয়াই শুধু নয়, টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে তার ভবিষ্যত পথরেখা নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে এই টেস্টের পারফরম্যান্স।


টেস্ট ক্রিকেটের বাংলাদেশ ও মাহমুদউল্লাহকে এক সুতোয় গাঁথা যায় খুব সহজেই। পথচলা অনেক দিনের, সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু সেই সম্ভাবনার পূর্ণ প্রতিফলন পড়েনি পারফরম্যান্সে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলার ১৮ বছর পূর্ণ হলো শনিবার। গত কয়েক বছরে উন্নতির ছাপ রাখতে পারলেও দেড় যুগে যেখানে যাওয়ার কথা, সেই উচ্চতা স্পর্শ করতে পারেনি টেস্টের বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহও তেমনি ৯ বছরের ক্যারিয়ারে খুঁজে পাননি টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে নিজের জমিন।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টেও বাংলাদেশ হেরে গেলে দেশের ক্রিকেটে অনেক বড় ধাক্কা হজম করবে, সন্দেহ নেই। তবে খেলা একের পর এক চলতেই থাকবে। মিরপুর টেস্টের পঞ্চম দিনে সিরিজ খেলতে চলে আসবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশ দল এগিয়ে যাবে। কিন্তু মিরপুর টেস্টে মাহমুদউল্লাহ ভালো না করলে, তার টেস্ট ক্যারিয়ারে এগোবে কিনা, সেই সংশয় তীব্র। ব্যাট হাতে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এতটাই মলিন যে, মিরপুরে উজ্জ্বল হতে না পারলে জায়গা ধরে রাখার পক্ষে থাকবে না খুব একটা যুক্তি।

সবশেষ যে আট টেস্ট ইনিংসে ২০০ ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশ, এই সময়টায় এক ইনিংসেও ২০ ছুঁতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। ৮ ইনিংস মিলিয়ে করেছেন ৫৮ রান, তিন ইনিংসেই ফিরেছেন শূন্য রানে।

মাহমুদউল্লাহর টেস্ট ক্যারিয়ার বাংলাদেশ ক্রিকেটে হতে পারে গবেষণার বিষয়বস্ত। রঙিন পোশাকে যিনি এতটা অপরিহার্য, দলের প্রয়োজনে নানা সময়ে নিজেকে ভেঙে গড়েছেন, নিজের ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন পরের পর্যায়ে, সেই ক্রিকেটারই কেন পরিচয় গড়তে পারলেন না টেস্ট ক্রিকেটে! টেস্টের বাইরে প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার খারাপ নয়। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ভালো করা অন্যদের চেয়ে স্কিল খুব খারাপ নয়। পরিশ্রমে ঘাটতি রাখেন না। টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি আবেগ, গুরুত্ব ও বোধে কমতি নেই। এরপরও কেন পারছেন না?

অথচ টেস্ট ক্রিকেটে শুরুটা তার খারাপ ছিল না। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে অভিষেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। প্রথম টেস্টে ব্যাটিংয়ে ভালো না করলেও বোলিংয়ে ইনিংসে পাঁচটিসহ ম্যাচে নিয়েছিলেন আট উইকেট। মূল কাজ ব্যাটিংয়েও আলো ছড়াতে থাকেন দ্রুতই।

টেস্টে তখন ড্র করাই ছিল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। একাদশ সাজানো হতো ব্যাটিং অর্ডার লম্বা করে। মাহমুদউল্লাহর ভূমিকা ছিল আট নম্বরে ব্যাট করা। ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে দেখা পেলেন প্রথম ফিফটির, চতুর্থ টেস্টে জহির খানের রিভার্স সুইং ও হরভজন সিংয়ের স্পিন সামলে খেললেন অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংস। ধারাভাষ্যকক্ষে বসে সুনিল গাভাস্কার ঘোষণা করলেন, “বিশ্বের সেরা আট নম্বর ব্যাটসম্যান।”

সেই তকমাকে তিনি আরও পোক্ত করলেন পরের টেস্টেই। প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি উপহার দিলেন নিউ জিল্যান্ডের কন্ডিশনে। সেই সফর থেকে দেশে ফেরার পর পরের সিরিজে পেলেন ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন। পাঁচে নেমে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টে করলেন দুটি ফিফটি।

কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা হারিয়ে যেতে থাকল ক্রমেই। তার ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে নাড়াচাড়াও হয়েছে প্রচুর। ওয়ানডেতে সে সবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেও পারেননি টেস্টে। ২০১৪ সাল থেকে ভূমিকা পেলেন চারে ব্যাট করার। টানা সুযোগও পেলেন। কিন্তু বারবার থিতু হয়ে আউট হয়েছেন, ভালো শুরু করেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। অনেক সম্ভাবনাময় ইনিংস থমকে গেছে তিরিশ-চল্লিশে। ২০১১ সালে সহ-অধিনায়ক মনোনীত হয়েছিলেন। বাজে ফর্মের ধাক্কায় নিজেই ছেড়ে দেন সেই দায়িত্ব।

একটা সময় জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু হলো। এবং অবধারিতভাবে, সেই সময়ও এসে গেল, গত বছর শ্রীলঙ্কার সফরে জায়গা হারালেন একাদশে, যেটি ছিল দেশের শততম টেস্ট। সেটি নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য করার সুযোগও ছিল না, পারফরম্যান্স সত্যিই ছিল তেমনই।

দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া সিরিজেও থাকলেন বাইরে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সাকিবের না থাকা ও অভিজ্ঞতার তাড়না থেকে আবার ফেরানো হলো। নতুন শুরুর ইঙ্গিতও দিলেন। প্রথম টেস্টে করলেন ফিফটি, পরের টেস্টে ছিল ৪৩ রানের ইনিংস। খুব ভালো নয়, তবে সতীর্থদের ব্যর্থতার সিরিজে কিছু একটা অন্তত তিনি করতে পেরেছিলেন।

গত ডিসেম্বরে আরেকটা মোড় এলো তার টেস্ট ক্যারিয়ারে। সাকিব আল হাসানকে নতুন টেস্ট অধিনায়ক করার পাশাপাশি মাহমুদউল্লাহকে করা হলো সহকারী। সাকিবের চোটে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে নেতৃত্বের অভিষেকও হয়ে গেল। চট্টগ্রাম টেস্টে দুই ইনিংসে করলেন অপরাজিত ৮৩ ও অপরাজিত ২৮। আবার তার টেস্ট ক্যারিয়ারে বইতে শুরু করল স্বস্তির হাওয়া।

কিন্তু সেই হাওয়া রূপ বদলে অস্বস্তির দমকা বাতাসে রূপ নিল ক্রমেই। শ্রীলঙ্কা সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট থেকে এবার জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম টেস্ট পর্যন্ত দেশের টেস্ট ব্যাটিংয়ের যে দুর্দশা, তাতে মিশে মাহমুদউল্লাহর হতশ্রী ফর্মও। আরও একটি টেস্টে রান না পেলে নিজেকে টেস্ট স্কোয়াডে পাওয়া তার জন্য কঠিনই হবে।

পরিস্থিতির আঁচ মাহমুদউল্লাহর গায়েও লাগছে। তাড়নাটা তিনিও অনুভব করছেন। কতটা জরুরি অবস্থা, উপলব্ধি করতে পারছেন। মিরপুর টেস্ট শুরুর আগের দিন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জানালেন, দল ও নিজের ব্যাটকে রাঙাতে চান একই সাফল্যের রঙে।

“আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ভালো অধিনায়ক হতে হলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। চেষ্টাও করি মাঠে এবং মাঠের বাইরে যেন আমি এই দিক থেকে এগিয়ে থাকতে পারি। সবার আগে আমি একজন ব্যাটসম্যান, সুতরাং ব্যাটিং দিয়ে যেন অবদান রাখতে পারি, সেই চিন্তা থাকেই। গত তিন-চারটি ম্যাচে আমার ভালো কোন ইনিংস নেই, অবশ্যই আমি আমার পারফরমেন্স নিয়ে চিন্তা করছি। এই ম্যাচে আমার সেরা চেষ্টাটাই করব যেন দলকে ভাল কিছু দিতে পারি।”

 

Facebook Comments

" ক্রিকেট নিউজ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ