Foto

মামলা হচ্ছে আরসিবিসির বিরুদ্ধে


বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কোর্টে এ মাসেই মামলা হচ্ছে। অর্থাৎ, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এ মামলা করা হবে। মামলায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনকে (আরসিবিসি) একমাত্র বিবাদী করার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদিও শেষ সময়ে ফিলিপাইনের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে মামলায় যুক্ত করা হতে পারে।


বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনজীবী, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ করা আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। মামলা করার জন্য আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবে। সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মামলাটি করবে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ দেওয়া দুই ল’ ফার্ম। মামলায় আরসিবিসিকে বিবাদী এবং নিউইয়র্ক ফেডকে যুক্ত না করার বিষয়টি চূড়ান্ত। আর মামলার আগে আগামী ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ল’ ফার্মের একটি চূড়ান্ত বৈঠক হবে। মামলা করার পর প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে নিউইয়র্ক ফেড এবং সুইফটের প্রতিনিধি দল ফিলিপাইনে যাবে। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন তারা। যদিও এ দু’পক্ষ মামলায় বিবাদী হবে না। এসব কারণে নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটকে মামলায় জড়ানোর বিষয়ে ভাবা হচ্ছে না।

যদিও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের বিরুদ্ধে কেন মামলা করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনজীবীরা বলেছেন, বাংলাদেশের মতো নিউইয়র্ক ফেডও ঘটনার শিকার। এ ছাড়া নিউইয়র্ক ফেডকে বিবাদী করা হলে স্বাভাবিকভাবে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। আবার ফেডের বিরুদ্ধে মামলা করে জয়ী হওয়াটাও কঠিন। ফলে ফেডের বিরুদ্ধে মামলার চিন্তাভাবনা বাদ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দেশটির সম্পৃক্ততা রয়েছে এ ধরনের ঘটনার পর তিন বছরের মধ্যে মামলা না করলে তার গুরুত্ব কমে যায়। এজন্য আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মামলা করার কথা আগে থেকেই বলে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের সাবেক ডিজিএম বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক মো. জাকের হোসেন এবং বিএফআইইউর যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রব ঢাকা ছাড়বেন। আর লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ করা দুই ল’ ফার্মকে সঙ্গে নিয়ে মামলা করা হবে।

এর আগে ৮ জানুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম ও বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানসহ চার সদস্যের প্রতিনিধি দল দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে আসে। প্রতিনিধি দল দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করার পর মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।

জানতে চাইলে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান মামলার আগে বাদী বিবাদীর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে চাননি। তবে তিনি সমকালকে বলেন, যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত এবং সুবিধাভোগী, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলাটি হবে বলে তিনি জানান।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ভুয়া পেমেন্ট অর্ডারের বিপরীতে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে শ্রীলংকায় যাওয়া ২ কোটি ডলার বিতরণ হওয়ার আগেই ফেরত পায় বাংলাদেশ। আর ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে দেশটির আদালতের নির্দেশে প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত আসে। এর পর থেকে পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার ফেরত পাওয়ার জন্য মামলা করা হচ্ছে। এসব অর্থের মধ্যে ১৪ মিলিয়ন ডলার ছাড়া বাকি অর্থের খোঁজ পাওয়া গেছে। যার বড় অংশই ফিলিপাইনের আদালতের নির্দেশে ফ্রিজ করা আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের আদালত আরসিবিসির সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে সম্প্রতি ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদ ও ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। এই সাজার মধ্য দিয়ে অর্থ পাচারের ঘটনায় মায়া আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হন। এর আগেও ফিলিপাইনের আদালতসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আরসিবিসি থেকে বেআইনিভাবে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইর এক তদন্তে উঠে আসে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও যে সম্পৃক্ততা নেই, সেটিও পরিস্কার হয়। এসব কারণে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করে অর্থ ফেরত পাওয়া সহজ হবে বলে বাংলাদেশের সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ