Foto

মাইক্রোচিপের যুদ্ধ


আমাদের চারপাশে এখন কত যন্ত্র! ভেবে দেখেছেন, এসব যন্ত্র চালাচ্ছে কে? যেকোনো ডিজিটাল যন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে মাইক্রোচিপ। মাইক্রোচিপ না হলে এত ছোট কম্পিউটার বা যন্ত্র আদৌও তৈরি করা যেত না। ডেটা বা তথ্যকে যদি আধুনিক যুগের তেল বলা হয়, তবে চিপকে বলা চলে ইঞ্জিন, যা ওই তেলকে উপযোগী করে তোলে।


এই মাইক্রোচিপ নিয়েই এখন কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈশ্বিকভাবে ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলোয় চিপের চাহিদাও। এতে প্রসারিত হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা বা চিপ নির্মাণ খাত। চিপ তৈরিতে এত দিন শুধু মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে। কিন্তু এখন চিপের রাজ্যে হানা দিচ্ছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। শুরু হয়ে গেছে ‘চিপযুদ্ধ’। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তাদের আর দমিয়ে রাখাও সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে ২০১৭ সালে চিপের বাজার ছিল ৪১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের, যা ২০১৬ সালের চেয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। চিপ নিয়ে বিশাল বৈশ্বিক শিল্প গড়ে উঠেছে। আধুনিক ও জটিল মাইক্রোচিপের অত্যাধুনিক কারখানা তৈরির কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় করছে। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ছড়ি ঘোরানোর বিষয়টি মেনে নিতে চাইছে না চীন। চিপ যুদ্ধের উদাহরণ কিন্তু চোখের সামনেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা না মানায় হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝুকে আটক করেছে কানাডা। তাঁর বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে টেলিকম যন্ত্রপাতি ব্যবসার অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে হুয়াওয়ে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, হুয়াওয়ের বড় বাধা আসবে মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠানের চিপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছে তারা। তাই নিজস্ব চিপ তৈরির পথে হাঁটছে হুয়াওয়ে। চীনের আরেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেডটিইকেও একইভাবে ‘চিপ সংকটে’ ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন জেডটিইর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানকে যন্ত্রপাতি বিক্রি করায় শাস্তি দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান জেডটিইকে চিপ সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সময় যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার সে দেশে জেডটিইর যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ঝুঁকির কথা জানায়। ওই প্রান্তিকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি লোকসান গুনতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনায় রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ। বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীন থেকে আমদানি করা শত শত বিলিয়ন ডলার পণ্যের ওপর শুল্ক বসানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা বেশ কিছু পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে। বেইজিং অভিযোগ করেছে, অর্থনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে এ নিয়ে অভিযোগও করেছে। ট্রাম্পের এই বাণিজ্যযুদ্ধকে অনেকটাই পুরোনো ধাঁচের যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে ইকোনমিস্ট। এ যুদ্ধে ট্রাম্প শুল্কারোপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। গাড়ি, স্টিল থেকে নানা পণ্যে তিনি শুল্ক চান। যুক্তরাষ্ট্র এ চীনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের ক্ষেত্রে এ বাণিজ্যযুদ্ধ বড় ভূমিকা রাখছে। এ যুদ্ধের নেপথ্যেই চলছে ‘চিপযুদ্ধ’। গত শনিবার আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পরস্পরের দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপ করা স্থগিত রাখতে রাজি হন। কিন্তু হুয়াওয়ের কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে বিষয়টি উল্টো মোড় নিয়েছে। এ ঘটনায় বেজায় ক্ষুব্ধ চীন।ইকোনোমিস্টের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ২১ শতকের এ বাণিজ্যযুদ্ধ মূলত প্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে প্রতিযোগিতার বিষয় হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) থেকে শুরু করে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সবকিছুই। তবে যুদ্ধের মূল ভিত্তিটা হচ্ছে ওই সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ধরে রাখা আর চীনের সুপারপাওয়ার হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েই মূলত দ্বন্দ্বের শুরু। জি-২০ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের চুক্তিকে ছাপিয়ে যাবে এ ‘চিপযুদ্ধ’। চিপযুদ্ধ শুরুর অনেক কারণ আছে। প্রধান কারণ হচ্ছে কম্পিউটার চিপ এখন ডিজিটাল অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এখন চিপসমৃদ্ধ গাড়িগুলো যেমন গতিসম্পন্ন কম্পিউটারে রূপ নিচ্ছে, তেমনি ব্যাংকগুলোও হয়ে যাচ্ছে গতিশীল লেনদেনের ক্ষেত্র। এখনকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দখল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলোর হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে এগিয়ে রয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চিপের জন্য চীনকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে নির্ভর করতে হচ্ছে। তেল আমদানিতে চীনের যত ব্যয় হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর আমদানিতে। বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি সেমিকন্ডাক্টর বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় চীনের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি বুঝতে পেরে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগেই সেমিকন্ডাক্টর খাতটিকে এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করে চীন। ২০১৪ সালে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ লক্ষ্য নিয়ে ২০১৫ সালে একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করে দেশটি। চীনের এ ঘোষণায় সতর্ক হয় যুক্তরাষ্ট্র। চীনের উন্নত প্রযুক্তির শিল্প তৈরির লক্ষ্য আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন ওবামা প্রশাসন। ২০১৫ সালে চীনের বাজারে ইনটেলকে পণ্য বিক্রিতে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি, ২০১৬ সালে কোনো চীনা প্রতিষ্ঠান যাতে সহজে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়। ওবামা আমলের গৃহীত ব্যবস্থাগুলো আরও শক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। চীনা প্রতিযোগিতার ভয়ে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোয়ালকমকে সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি হওয়া ঠেকানো হয়েছে। এর বাইরে জেডটিইর কাছে মার্কিন চিপ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। চিপযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রযুক্তি বিশ্বে এখন দুটি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। একটি বিষয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উপলব্ধি। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে তারা প্রযুক্তি উন্নয়নে চীনের চেয়ে এগিয়ে। তারা প্রয়োজন মতো বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বসাতে পারছে। এ ছাড়া সীমান্তে কড়াকড়ি করতে পারছে তারা। আরেকটি পরিবর্তন হচ্ছে চীনের স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা। সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভর হতে চীন সরকারের প্রণোদনা বেড়ে গেছে। জেডটিইর ঘটনার পরে দেশটির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। এরপর আলিবাবা, বাইদু ও হুয়াওয়ে চিপ তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চীন দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রুখে দিতে পারে। ইতিমধ্যে বড় ধাক্কাও দিয়েছে তারা। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক চিপ নির্মাতা এনএক্সপি সেমিকন্ডাক্টরস কিনতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল কোয়ালকম ইনকরপোরেশন। ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের এ অধিগ্রহণ চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। বৈশ্বিক নয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে আটটির অনুমোদন মিললেও চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ অধিগ্রহণে অনুমোদন দেয়নি। এর পেছনে কারণ ছিল ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের মধ্যে চলমান ওই বাণিজ্যযুদ্ধ।

Facebook Comments

" প্রযুক্তি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ