Foto

ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা


সালমা নাহারের বয়স ছিল ২২ বা ২৩ বছর। লেবাননে কাজের জন্য গিয়েছিলেন। আড়াই বছরের মাথায় তিনি দেশে ফিরেছেন লাশ হয়ে। মাদারীপুরের সালমা অত্যাচারের কারণে সংসার করতে পারেননি। ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমানে ১০ বছর বয়সী ছেলে ও নিজের ভবিষ্যতের জন্যই লেবাননের পথে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি।


সালমার বাবা মো. জুলহাস সালমা যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাদের কাছে শুনেছেন, মেয়ে নাকি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। কিন্তু জুলহাসের মনের সন্দেহ দূর হচ্ছে না। জুলহাস বললেন, "মেয়ে পানি পাইলো কই? ও তো সাঁতার পারত, ডুইব্যা মরবো ক্যান? কেউ কেউ বলে, ওরে কেউ মাইরা ফালাইছে। বিদেশের কথা কেমনে কী কমু।"

জুলহাস খবর পেয়েছেন সালমা মারা যাওয়ারও তিন মাস পর। এরপর ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মেয়ের লাশ দেশে আনেন। মেয়ে লেবাননে কী কাজ করতেন, তা–ও জানেন না এই বাবা। সালমা ছেলের খরচের জন্য কখনো ৫ হাজার, কখনো ১০ হাজার টাকা পাঠাতেন দেশে। এ ছাড়া থোক কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন।লেবানন থেকে লাশ আনতে এই বাবার কোনো খরচ হয়নি। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাশ আনার সময় সরকারের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকার চেক পেয়েছেন। এর বাইরে সরকারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াচ্ছেন।

মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে লাভ কী হলো প্রশ্নে জুলহাস বললেন, "মেয়ের কথা মনে হইলে বুকটা ফাইট্যা যায়। দুই ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে ও ছিল সবার বড়। বলছিল, বিদেশ যাইয়্যা টাকা কামাই কইরা ছোট বইনরে বিয়া দিব। নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ বানাইবো। এখন লাভের মধ্যে লাভ হইলো, মেয়ের লাশটা দেখবার পারছি।"


হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা লাশের তথ্য বিশ্লেষণ করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ২৯৪ জন নারী শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে। ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ জন এবং গত বছর ১১২ জনের লাশ দেশে আসে। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে আসা লাশের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জনে।মারা যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে ব্র্যাক বলছে, ২৯৪ জনের মধ্যে সব থেকে বেশি ১১০ জনই মারা গেছেন স্ট্রোক বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫০ জন। আর আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। অন্যান্য কারণে মারা গেছেন ৩১ জন নারী।

সরকারের হিসাব বলছে, এখন পর্যন্ত নারী শ্রমিকেরা বেশি যাচ্ছেন সৌদি আরবে। সেই হিসাবে সৌদি আরব থেকেই বেশি লাশ আসছে (১১২ লাশ)। এরপরেই জর্ডান, লেবানন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই পাঁচটি দেশ।

তবে দেশে থাকা মৃত নারীর পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দিহান। ২৫ বছর বয়সী জহুরা বেগম সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে ফিরেছেন লাশ হয়ে। জহুরার বৃদ্ধ মা আলেয়া বেগম জানালেন, জহুরা যখন ছোট, তখন তাঁর বাবা মারা যান। জহুরা যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন তাঁর স্বামী মারা যান। জহুরা মারা যাওয়ার ১০ মাস পর লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়।মুন্সিগঞ্জের এই মা আলেয়া অন্যের বাড়িতে কাজ করে এখন মেয়ে জহুরার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন। জহুরার বড় বোন রোখসানা বললেন, "মনডায় কয়, বইনডারে কেউ মাইরা ফালাইছে। ও ছোট থেইক্যা কম তো কষ্ট করে নাই। ছেলে জন্মানোর তিন দিন পরেই কাজে যোগ দিছিল। মরতে চাইলে দ্যাশে থাকনের সময়ই আত্মহত্যা করত।"

জহুরার পরিবার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক পেয়েছে, এর বাইরে আর কিছু পায়নি। জহুরার বোনের ভাষায়, "৩৫ হাজার টাকার বাইরে চাইর আনাও পাই নাই। বইনের লাশের সঙ্গে ম্যালা কাগজ দিছে, যা কোনো কামেই লাগে নাই।"

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বললেন, কয়েক বছর ধরে নারী শ্রমিকের লাশ আসার সংখ্যাটা বেড়েছে। ব্র্যাকের নিজস্ব পর্যালোচনায় গত তিন বছর দুই মাসে প্রায় ৩০০ নারীর লাশের মধ্যে বেশির ভাগ মারা গেছেন স্ট্রোক করে। কাজের চাপসহ বিভিন্ন কারণে না হয় মৃত্যু মেনে নেওয়া হলো। কিন্তু প্রায় অর্ধশত নারী কেন আত্মহত্যা করলেন? এই নারীরা তো ভাগ্যের উন্নয়নে চোখে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন। তাহলে কী এমন পরিস্থিতি হলো যে তাকে আত্মহত্যা করতে হলো?
সরকারকে এ ধরনের মৃত্যুগুলো তদন্ত করে দেখা উচিত। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে গত বছর অর্থাৎ ১০ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে ২৬ হাজার ৭৫২ শ্রমিকের লাশ এসেছে। তবে এই লাশের মধ্যে নারী শ্রমিকের লাশের আলাদা কোনো তথ্য নেই।প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বিদেশে মারা যাওয়া শ্রমিকের লাশ দেশে আনা, দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক তিন লাখ টাকা অনুদান দিচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ জুলহাস বললেন, প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ১০টি করে (নারীসহ) শ্রমিকের লাশ দেশে আসছে। অনেক পরিবার লাশ দেশে আনতে চায় না। যারা আনতে চায় তাদের সহায়তা করা হয়। আর মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ আছে—পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। পরিবার চ্যালেঞ্জ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে।চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই কুয়েত থেকে রিনা আক্তারের লাশ দেশে এনেছেন তাঁর স্বামী মো. আবু জাফর। ২০১০ সালে বিয়ের আগে থেকে কোম্পানিতে কাজের সুবাদে কুয়েতেই পরিচয় হয়েছিল জাফর আর রিনার। বর্তমানে দুই কোম্পানিতে কাজ করতেন স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের আগে ও পরে সব মিলিয়ে কুয়েতে কেটে গেছে প্রায় ২২ বছর। একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা বরিশালের রিনা বাথরুমেই মারা যান। তাঁর মৃত্যু সনদে "স্ট্রোক" লেখা আছে। এই দম্পতির কোনো ছেলেমেয়ে নেই।

আবু জাফর জানালেন, কোম্পানি নিজ খরচে রিনার লাশ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে, তবে আবু জাফরকে নিজের টাকায় লাশের সঙ্গে দেশে আসতে হয়েছে। আবু জাফরের মতে, রিনার তেমন কোনো অসুখ ছিল না। "হঠাৎ স্ট্রোক" করেন তিনি। জানালেন, কুয়েতে রিনা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন, সেখান থেকে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। স্বামী-স্ত্রী যা আয় করতেন, তার বেশির ভাগই দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতেন, ফলে সঞ্চয় বলতেও তেমন কিছু নেই।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ