Foto

ব্র্যাকের উদ্যোগে বদলাচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত তারুণ্য


সিলেটের শাহপরান থানার মেয়ে রাহেলা। দিনমজুর পিতা আর গৃহিণী মায়ের সংসারে সে সবার বড়। ছয় ছেলেমেয়ের খাইখরচ মিটাতেই হিমশিম খেতে হয় দরিদ্র বাবাকে। তাই পঞ্চম শ্রেণির পর পড়ালেখা আর এগোয়নি রাহেলার। কীভাবে কী কাজ করে সে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে সংসারে সাহায্য করতে পারে, সেদিকেই দৃষ্টি ছিল সবার। তবে দক্ষতা না থাকায় ঘরে বসেই দিন-মাস কাটছিল তার।


এরই মধ্যে ২০১৫ সালে ১৭ বছর বয়সে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সঙ্গে সংযোগ ঘটে কিশোরী রাহেলার। ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির (এসডিপি) আওতায় ’বিউটিফিকেশন’ কোর্সে ভর্তি হয় সে। এভাবে ’বিউটিশিয়ান’ হওয়ার সুযোগ সামনে আসে তার। এ জন্য হাতেকলমে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেয় সে। কাজে দক্ষ হয়ে ওঠায় বেকারত্ব থেকে মুক্তি ঘটেছে তার।

প্রশিক্ষণের সময় প্রতি মাসে রাহেলাকে দেওয়া হতো এক হাজার টাকা। প্রশিক্ষকরাও পান সমপরিমাণ অর্থ। এভাবে প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থীকে খানিকটা আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে ব্র্যাক কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে সাফল্য পায়। নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করে রাহেলা এখন কাজ করছে সিলেটের শিবগঞ্জের ’অপরূপা বিউটি পার্লারে’। শুধু রাহেলা নয়- তিশা, আইরিন, মাধবী আর মোমেনারাও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যম কোনো না কোনো কাজ করছে। কারিগরি কাজে দক্ষ হয়ে ওঠায় বসে থাকতে হচ্ছে না তাদের। বদলে যাচ্ছে ১৪-১৮ বছর বয়সী অসচ্ছল পরিবারের কিশোর-কিশোরী আর তরুণদের জীবন। এ পর্যন্ত ৪৬ জেলায় এমন ৩৩ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক হান্নান খান সমকালকে বলেন, সারাদেশে এ কর্মসূচি শুরু হয় ২০১২ সালে। সিলেটে ২০১৪ সালে তারা কাজ শুরু করেন। এ পর্যন্ত তারা দেড় হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে তারা সাফল্য পেয়েছেন।

এসডিপির আওতায় ১৭ ধরনের কাজ শেখানো হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশন, টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, বিউটিফিকেশন, আইএসটি (কম্পিউটার), উড ফার্নিচার ডিজাইনিং, উড ফার্নিচার মেকিং, অ্যালুমিনিয়াম ফেব্রিকেশন ইত্যাদি। প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বাল্যবিয়ের বিড়ম্বনার শিকার কিংবা স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের মতো পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন মানুষও নিতে পারেন দক্ষতা উন্নয়নের এ সুযোগ।

এ রকমই একজন সিলেটের পরগনা বাজারের সালেহ আহমদ। জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। কিন্তু মোবাইল ফোন সার্ভিসিং কোর্স শিখে তিনি এখন স্বাবলম্বী। পরগনা বাজারের মসজিদ মার্কেটে তার নিজের দোকান ’তানজিল টেলিকম অ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোর’। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, প্রতিবন্ধী হলেও তিনি এখন প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করতে পারছেন। তার যাতায়াতের জন্য ব্র্যাকের পক্ষ থেকে থ্রি-হুইলার গাড়িসহ আনুষঙ্গিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

এসডিপির আওতায় সিলেটে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রয়েছেন সাড়ে সাতশ’ প্রশিক্ষক। তাদের সবার রয়েছে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ রকম একজন ’মোনালিসা লেডিস টেইলার্স’-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদা আলম। তিনি জানান, প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন পাঁচ ঘণ্টা করে শেখানো হয়। একদিন তত্ত্বীয় ক্লাস চলে ব্র্যাকের আঞ্চলিক অফিসে। এভাবে ছয় মাসের কোর্স শেষ হয়।

ব্র্যাকের এসডিপি কর্মসূচির প্রধান তাসমিয়া রহমান বলেন, ১৪ থেকে ১৮ বছর সংবেদনশীল বয়স। এ সময়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোররা বহুমুখী কারণে হতাশা থেকে বিপথে পা বাড়াতে পারে। এসডিপির মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মেয়েরা বেশি উপকৃত হচ্ছে। তাদের অনেকে বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। অন্যদিকে স্বাবলম্বিতা অর্জন করছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে বাছাইকৃতদের পরে ১৪ দিনের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে তারা নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারে। তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ