Foto

বাড়ছে শিশুদের চোখের ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা


মাত্র ৭ বছর বয়স থেকেই মাইয়োপিয়া বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি রোগে আক্রান্ত হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিমা রশীদ। ১০ বছরের অনিমার সমস্যা দূরের বস্তু ঝাপসা দেখে। এ সমস্যা নিয়ে মাঝে-মধ্যেই তাকে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হয়। চিকিত্সক বলেছেন, দিনের বেশির ভাগ সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে অনিমা।


অনিমা বলে, ফোনে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখি, গেমস খেলি। অনিমার বাবা আতিকুর রহমান বলেন, মেয়ে প্রথমে চোখ কুচকিয়ে টিভি দেখতো। টিভি দেখতে দেখতে মাঝে মধ্যে টিভির সামনে চলে যেত। টিভিতে কার্টুন দেখা শেষ হলে কিংবা টিভি বন্ধ করে দিলে, চুপি চুপি ওর মায়ের মোবাইল ফোন অথবা আমার ফোন নিয়ে গেমস খেলতে শুরু করতো। এখন ক্লাসে পেছনে বসলে বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখে।

দেশে অনিমার মতো শিশুদের চোখের ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। এক দশক আগেও ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের এমন অবস্থা দেখা না গেলেও, বর্তমানে স্মার্টফোন আর ট্যাবের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশুদেরও বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের চোখে অতিরিক্ত স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি বড়দের চোখের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে। তারা জানান, গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখে এই সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এর কারণ অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার করা। দীর্ঘ সময় চোখ স্ক্রিনে রাখার ফলে, স্ক্রিন থেকে আসা রশ্মি শিশুদের চোখের ক্ষতি করছে এবং চোখ স্থির হয়ে থাকার কারণে চোখ শুকনো হয়ে যায়, ফলে চোখের বিভিন্ন ক্রটি দেখা দেয়।

সরেজমিনে রাজধানীর একটি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়— একটি ক্লাসে ২৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে চোখে চশমা ব্যবহার করছে। এদের একজন জায়েদ আল আতিফ বলে, আমি ৩ বছর ধরে চশমা ব্যবহার করছি। আমার চশমার পাওয়ার একটাতে ২ পয়েন্ট ৭৫ এবং অন্যটিতে ৩ পয়েন্ট জিরো। আরেকজন শিক্ষার্থী সাব্বির মাহবুব বলে, আমি বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখি। সে কারণে চশমা দিয়েছে ডাক্তার। আমি আগে অনেক বেশি মোবাইলে গেমস খেলতাম। ডাক্তার নিষেধ করার পর এখন বেশি খেলি না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটবেলা থেকে স্মার্টফোন, ট্যাবে ভিডিও গেমসের আসক্তি শিশুদের চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের জন্য খেলার মাঠ বন্ধ হয়ে যাওয়া, লেখাপড়ার বাড়তি চাপ, সূর্যের আলোয় শিশুর না আসা, দিগন্তে সবুজের দিকে তাকিয়ে না থাকাকেই দায়ী করা হচ্ছে। তারা আরো বলছেন, শিশুদের যে সময় দূরের দৃষ্টি তৈরি হওয়ার কথা, সে সময়ই তারা মোবাইল ফোনের কিংবা ট্যাবের স্ক্রিনে দৃষ্টিকে আটকে রাখছে। যে কারণে দূরের দৃষ্টি প্রসারিত হতে পারছে না। বংশগত কারণেও এই ক্ষীণ দৃষ্টি হতে পারে, তবে স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি, রোদে খেলাধুলা না করা শিশুদের মাইয়োপিয়ার অন্যতম কারণ।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বিভিন্ন স্কুলে শিশুদের চোখ পরীক্ষা করে থাকি। এতে দেখা যাচ্ছে গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখের সমস্যাটা বেশি। তবে অবিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশু যদি টিভির সামনে গিয়ে টিভি দেখে, বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখে তাহলে চিকিত্সকের কাছে যেতে হবে। ক্ষীণ দৃষ্টির চিকিত্সা মূলত চশমা ও কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার এবং ল্যাসিক করানো।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান আনজুম ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের খেলার জায়গা নেই। তারা চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে। ঘরে বসে বসে তারা ট্যাব, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। আমরা খাওয়া-দাওয়ার কথা বলি, কিন্তু সেটা অতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্কুলে মাঠ নেই এটাও শিশুদের এই ক্ষীণ দৃষ্টির একটি কারণ। যেখানে মাঠ আছে সেখানেও শিশুরা খেলছে না। তিনি আরো বলেন, শিশুদের রোদে মাঠে খেলতে দিতে হবে এবং ট্যাব মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে হবে। তবে মাঝে মধ্যে ডেক্সটপে বসতে পারে। কারণ ডেক্সটপে চোখের ওপর চাপ অনেক কম পড়ে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে আমরা ২৫০ জন রোগী দেখি। এর মধ্যে ক্ষীণ দৃষ্টি বা মাইয়োপিয়ার আক্রান্ত শিশু আসে গড়ে ৫০ জন। যারা বিভিন্ন ধরনের চশমাজনিত ক্রটি নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, যারা দূরে দেখতে পারে না, এ ধরনের চোখের ক্রটিকে বলে ক্ষীণ দৃষ্টি বা মাইয়োপিয়া, যে শিশুরা দূরেও কম দেখে কাছেও কম দেখে, এ ধরনের ক্রটিকে বলা হয়—’হাইপারমেট্রপিয়া’, আরেক ধরনের চোখের সমস্যা নিয়ে শিশু আসে, যাদের আমরা বলি ’এস্টিগমেটিজম’, যাদের সিলিন্ডার পাওয়ার বা এঙ্গেল পাওয়ারে ক্রটি থাকে। এই তিন ধরনের ক্রটি নিয়ে শিশুরা আমাদের কাছে বেশি আসে। এ ধরনের শিশুদের যদি স্কুল শুরুর আগেই চোখ পরীক্ষা করানো যায় তাহলে তাদের এ ধরনের ক্রটি ভালো হয়ে যায়।

এই চিকিত্সক আরো বলেন, অনেক অভিভাবক জিজ্ঞেস করেন, ভবিষ্যতে বাচ্চা চাশমা ছাড়া কি দেখতে পারবে? এটা নির্ভর করে চশমা ব্যবহারের ওপর। তবে আমাদের টার্গেট থাকে চশমা দিয়ে যেন শিশু ভালো দেখতে পারে। এজন্য আমরা চশমা ব্যবহারে উত্সাহিত করছি। আজকাল শিশুরা অনেক বেশি গ্যাজেট ব্যবহার করছে। ফলে গ্রামের চেয়ে শহরের বাচ্চাদের এ ধরনের চোখের সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। টেকনোলজি শিশু ব্যবহার করবে তবে সেটা এক ঘণ্টার বেশি অবশ্যই নয়।

Facebook Comments

" লাইফ স্টাইল " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ