Foto

বগুড়ায়ও সংকটে বিএনপি


আইনি মারপ্যাঁচ আর মামলা-হামলার ফাঁদে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা, বেশির ভাগ আসনে ধানের শীষের তেমন প্রচারণা নেই, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি।


বিএনপির দুর্গখ্যাত বগুড়ায় নির্বাচনী প্রচারে সুবিধা করতে পারছে না দলটি। আইনি মারপ্যাঁচ আর মামলা-হামলার ফাঁদে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা। গ্রেপ্তার-আতঙ্কে অনেকেই এলাকাছাড়া হয়েছেন। বগুড়ায় সাতটি আসনে মোট প্রার্থী ৪৫। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে বেশির ভাগ আসনে ধানের শীষের তেমন প্রচারণা নেই।
এদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মভিটা বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নেই। আইনি জটিলতায় প্রচারণার মধ্যখানে এসে বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা স্থগিত হয়ে গেছে।

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা)
এই আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ আবদুল মান্নান এবারও নৌকার প্রার্থী। প্রতীক বরাদ্দের পর তিনি প্রচারণায় সরব। দুই উপজেলায় গণসংযোগ, পথসভা, কর্মিসভা, উঠান বৈঠক এবং প্রচারপত্র বিলি ও মাইকিং করে ভোট চাইছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নৌকার পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা নির্বাচনী এলাকা।
উল্টো চিত্র ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির সাবেক সাংসদ কাজী রফিকুল ইসলামের ক্ষেত্রে। প্রচারণার মাঠে খুব একটা দেখা যায়নি তাঁকে। এলাকায় তেমন দেখা যাচ্ছে না ধানের শীষের পোস্টার। গত বৃহস্পতিবার সোনাতলায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় নৌকার সমর্থকদের বাধার মুখে পড়েন বিএনপির সমর্থকেরা। পরে সংঘর্ষ বাধে।
পুলিশের সূত্রমতে, এই এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ১৪৮ জন। অজ্ঞাতনামা আসামি আরও কয়েক হাজার।
বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, তিনি নামতেই পারছেন না। তাঁর প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। পোস্টার টাঙালে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মান্নানের দাবি, বহিরাগত সন্ত্রাসী ভাড়া করে এনে নৌকার সমর্থকদের ওপর হামলা করে শান্ত মাঠ অশান্ত করছে বিএনপি। এ ছাড়া দলীয় কোন্দল থেকেই ধানের শীষের প্রচারণায় বাধা আসছে।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ)
এখানে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ। তিনি বিনা বাধায় ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইছেন, গণসংযোগ করছেন। আর ধানের শীষের প্রার্থী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। প্রতীক বরাদ্দের পর মান্নার পক্ষে প্রচারে নামেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে লাঙ্গল মার্কার প্রার্থীর গাড়িবহরে ককটেল হামলার অভিযোগে ১৭ ডিসেম্বর শিবগঞ্জ থানায় জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলমসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়।
মান্না সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, মাঠ ফাঁকা করতেই পরিকল্পিতভাবে এই মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। দুই দিন প্রচার চালিয়ে তিনি ঢাকায় ফেরেন। এখন গ্রেপ্তারের ভয়ে ধানের শীষের কর্মীরা মাঠে নামছেন না।

বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া)
এই আসনে আদমদীঘি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মুহিত তালুকদারকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় বিএনপি। পরে আদালতের আদেশে প্রার্থিতা আটকে গেলে তাঁর ভাবি মাছুদা মোমিন হাইকোর্টে রিট করে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন। তবে প্রচারণা শুরু করতে পারেননি এখনো।
অন্যদিকে আওয়ামী-সমর্থিত মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান সাংসদ নুরুল ইসলাম তালুকদার। বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতার সুযোগে তাঁর প্রচারণায়ও গা-ছাড়া ভাব লক্ষণীয়।

বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম)
মহাজোটের প্রার্থী জাসদের বর্তমান সাংসদ এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন। তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাঁর পক্ষে নামার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেও এখনো মাঠে দেখা যাচ্ছে না।
এখানে বিএনপির প্রার্থী মোশারফ হোসেন। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে জমজমাট নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। গণসংযোগ, পথসভা করছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ডাক দিচ্ছেন। এখানে বিএনপির গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।
এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন ওরফে হিরো আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচন কমিশনে আপিলেও এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। পরে উচ্চ আদালত থেকে প্রার্থিতা ফিরে পান হিরো আলম। সিংহ প্রতীক নিয়ে জমিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।

বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট)
আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সাংসদ হাবিবর রহমান। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই তাঁর পক্ষে চলছে ব্যাপক প্রচারণা। এখানে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন বিএনপির সাবেক সাংসদ জি এম সিরাজ। তিনিও নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বাধার মুখে পড়ছেন।
জি এম সিরাজ ১১ ডিসেম্বর ধুনটে হামলার শিকার হন। তাঁর গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে ৩টি গাড়ি এবং প্রায় ১২টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। আগের দিন রাতে নৌকার সমর্থকেরা যুবদলের নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দিলেও পুলিশ তা নেয়নি। উল্টো ১৭ ডিসেম্বর ককটেল হামলার অভিযোগে ধুনটের উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা তৌহিদুল আলমসহ ৭১ জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা হয়েছে।

বগুড়া-৬ (সদর)
মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান সাংসদ নূরুল ইসলাম ওমর। তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন, তবে তাঁর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত মাঠে সরব হননি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।
জিয়া পরিবারের আসন হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় খালেদা জিয়া এবারও প্রার্থী হয়েছিলেন। দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। পরে ধানের শীষের প্রার্থী হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গত ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর প্রায় ২৫টি পথসভায় বক্তব্য দিয়েছেন।

বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর)
মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল নিয়ে লড়ছেন মুহাম্মদ আলতাফ আলী। তবে তাঁর সঙ্গে নেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা। এখানে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হলে গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যান মোরশেদ মিলটনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে নির্বাচন কমিশনে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান। ইসির আদেশের বিরুদ্ধে রিট করেন ফোরদৌস আরা নামের এক প্রার্থী। তিনি গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ আজম খানের স্ত্রী। আদালত মিলটনের প্রার্থিতা স্থগিত করেছেন। এখন এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নেই।

 

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ