Foto

ফেসবুকে বিশ্বাস রাখিব কেমনে


শুধু ক্ষমা চাইতে চাইতেই গত বছরটা কাটিয়ে দিলেন মার্ক জাকারবার্গ। সঙ্গে ছিল সমস্যা কাটিয়ে ওঠার আশ্বাসও। কিন্তু সেই আশ্বাসবাণী বারংবার শুনতে শুনতে বড্ড পানসে হয়ে গেছে। এখন আর ফেসবুকের ব্যবহারকারীরা তাতে আস্থা রাখেন কিনা সন্দেহ! একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ফেসবুকে বিশ্বাস ধরে রাখাটাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


গত মাসে ফেসবুকের নতুন ‘স্ক্যান্ডাল’ প্রকাশিত হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহকদের অজান্তেই তাঁদের তথ্য অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেছে ফেসবুক। অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে—আমাজন, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, নেটফ্লিক্স, স্পটিফাই ও ইয়ানডেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান। এগুলোকে নিজেদের গ্রাহকদের তথ্যে প্রবেশাধিকার দেয় ফেসবুক।

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ফেসবুকের ২০১৭ সালের কিছু অভ্যন্তরীণ নথি থেকে এ খবর জানা গেছে। নথিতে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকদের তথ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রবেশাধিকার দিয়ে আসছিল ফেসবুক। এতে করে সব পক্ষই লাভবান হচ্ছিল। তবে এ নিয়ে ফেসবুক কখনোই গ্রাহকদের সামনে টুঁ শব্দটি করেনি!

২০১৮ সালের শুরুটাও ছিল এমনি। গত মার্চ মাসের ১৭ তারিখে ফাঁস হয় কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কাণ্ড। জানা যায়, লাখ লাখ ফেসবুক প্রোফাইল থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছিল কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামের প্রতিষ্ঠানটি। ওই ঘটনায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায় কমে গিয়েছিল ফেসবুকের স্টক শেয়ারের দাম। এরপর থেকে পুরো বছরজুড়েই নানা ঘটনায় নেতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান। গত মার্চের শেষ ভাগেই গড়ে ওঠে ‘ডিলিট ফেসবুক’ আন্দোলন, যা জারি ছিল বছরের শেষ অবধি। এপ্রিলে জানা যায়, ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার হাতে ছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহকের তথ্য। এই গ্রাহকেরা জানতেনই না যে, তাদের তথ্য অন্যের হাতে চলে গেছে।

সিএনএন বলছে, অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও স্যামসাংসহ বেশ কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফেসবুকের তথ্য আদান-প্রদানের সম্ভাবনার কথা যায়। এটি গত ৩ জুনের খবর। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন সিনেট কমিটিকে ফেসবুকের সিওও শেরিল স্যান্ডবার্গ জানান, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রুশ তৎপরতার বিষয়টি সার্বিকভাবে বোঝা তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ ফেসবুক ব্যবহার করে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি ঠেকাতে পুরোপুরি সফল হয়নি ফেসবুক। ওই মাসেই জানা যায়, নজিরবিহীন সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি এবং ৩ কোটি ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এরপর ফেসবুকের ব্যর্থতার তালিকা আরও লম্বা করে দেয় ডিসেম্বর মাসটি। নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, মাইক্রোসফটের বিং সার্চ ইঞ্জিন নাকি সব ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নাম দেখতে পেত। এই অনুমতি দিয়েছিল ফেসবুক। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত বার্তা দেখার অনুমতি ছিল নেটফ্লিক্স ও স্পটিফাই-এর। অন্যদিকে আমাজনকে ব্যবহারকারীদের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা দেখার অনুমতি দিয়েছিল ফেসবুক।

মার্ক জাকারবার্গ অবশ্য প্রতিবাদ করে বলতেই পারেন, ‘চেষ্টা তো কম করিনি।’ কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সেই চেষ্টা আদতে কতটুকু আন্তরিক? এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেছে জাকারবার্গের পদত্যাগের দাবিও। অবশ্য সংবাদমাধ্যম ওয়্যারড জানাচ্ছে, ফেসবুকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেকোনো বিরোধিতা সামাল দেওয়ার উপায় জানা আছে জাকারবার্গের। শেরিল স্যান্ডবার্গের অবস্থাও তেমনই। সুতরাং জাকারবার্গের সরে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব।

দ্য টাইমসের দাবি, ১৫০ টিরও বেশি কোম্পানির সঙ্গে ফেসবুকের তথ্য আদানপ্রদানের চুক্তি আছে। বলা হচ্ছে, ফেসবুক এর ব্যবহারকারীদের তথ্যে জেনেশুনেই প্রবেশাধিকার দিয়েছিল এবং তার পরিধি ছিল ব্যাপক।

ফেসবুক অবশ্য বছরজুড়েই ভাঙা রেকর্ডের মতো একই কথা শুনিয়ে গেছে। তা হলো—‘ব্যবহারকারীদের কোনো তথ্যের অপব্যবহার হয়নি’, ‘ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করা হয়নি’। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, আদতে অন্য কোম্পানির কাছে ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রিই করেছে ফেসবুক। হয়তো তথ্যের বদলে ট্যাঁকে ডলার আসেনি, কিন্তু এসেছে অন্যান্য মূল্যবান সুবিধা। এভাবেই চলেছে বিনিময় প্রক্রিয়া। সেটি বিক্রি নয়তো কি?

এত বিতর্ক ও সমালোচনার চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে ফেসবুককে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলছে, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ নিজে হারিয়েছেন প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। সিএনবিসি বলছে, ২০১৮ সালে ফেসবুকের স্টক শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

এ তো গেল আর্থিক ক্ষতির হিসাব। অন্যদিকে ফেসবুককে ছেড়ে গেছেন হোয়াটসঅ্যাপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জান কোউম। বিদায় বলে দিয়েছেন ইনস্টাগ্রামের সহপ্রতিষ্ঠাতা কেভিন সিসট্রম ও মাইক ক্রিগারও। এ ছাড়া ফেসবুকের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন সাধের প্রতিষ্ঠান। শুধু চলে গিয়েই ক্ষান্ত হননি তাঁরা, গলা চড়িয়েছেন সমালোচনাতেও।

নিন্দুকেরা বলছেন, জাকারবার্গের ফেসবুক এখন ‘অত্যন্ত ধনী’ ও ‘ক্ষমতাবান’ একটি প্রতিষ্ঠান। হাবভাবে মনে হচ্ছে, কাউকেই পরোয়া করছে না এটি। প্রশ্ন হলো—ফেসবুক কি পৃথিবীকে আরও নিরাপদ করবে? নাকি ক্ষমতাবান করপোরেশনের মতো রোজগারের জন্য যা খুশি তাই করবে?

২০১৮ সাল নিয়ে মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, গত বছরের সমস্যাগুলো ঠিক করতে এক বছর সময় লেগে যেতে পারে। না পারলে হয়তো এবারও ক্ষমা চেয়ে নেবেন। দিন শেষে ব্যবহারকারীদের বলে দেবেন, ‘উই আর সরি’

Facebook Comments

" প্রযুক্তি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ