Foto

পরিবার ও ডায়াবেটিস


আজ ১৪ নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে পরিবার ও ডায়াবেটিস। কেননা, দেখা যাচ্ছে যে প্রতিটি পরিবারই ডায়াবেটিস দ্বারা কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত। বিশ্বে প্রতি ১১ জনে একজনের ডায়াবেটিস আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরিবারকে সচেতন হতে হবে ডায়াবেটিস বিষয়ে। আর ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যাতে খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, দৈনন্দিন অভ্যাসের সম্পর্ক নিবিড়। এই বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে পরিবারই।


পারিবারিক মন্দ অভ্যাস ও ভুল জীবনযাত্রা একদিকে যেমন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তেমনি পরিবারই পারে একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে।

পরিবার পারে রুখতে
প্রায় ৭০ শতাংশ টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। কোনো পরিবারে যদি সুষম খাদ্যাভ্যাস, সুশৃঙ্খল জীবনপ্রণালির চর্চা করা হয়—তবে সেই পরিবারের সদস্যরা ডায়াবেটিস নামের এই রোগ থেকে সুরক্ষা পেতে পারেন। সুষম খাদ্য বলতে আমরা বুঝি দৈনন্দিন খাবার তালিকায় ৫০-৬০ শতাংশ শর্করা, ২০ শতাংশ আমিষ ও ২০ শতাংশ চর্বি থাকা। অতিরিক্ত ক্যালরি যুক্ত খাবার যেমন: ফাস্টফুড, তেল–চর্বিসমৃদ্ধ খাবার, কোমল পানীয়, কৃত্রিম জুস, বেশি চিনি বা ক্রিমযুক্ত বেকারি এড়িয়ে চলা। বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও গোটা শস্যের তৈরি শ্বেতসার গ্রহণ করা।

শিশু–কিশোরেরা নানা ধরনের সংরক্ষিত হিমায়িত খাবার, কেনা ফাস্টফুড ও কোমল পানীয়, কৃত্রিম জুসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই অভ্যাস তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে বাড়িতে।
শুধু তাই নয়, শৈশব থেকে খাবারের পছন্দ–অপছন্দও গড়ে তোলে পরিবারই। কোনো পরিবারে গরুর মাংস ভুনা প্রতিদিন চলছে, আবার কোনো বাড়িতে দেখবেন শাকসবজি মাছের চল বেশি। স্কুলে শিশুর টিফিন বক্স থেকে প্রতিদিন বার্গার বের হয়, কোনো শিশুর টিফিন বক্সে থাকে ফলমূল। এই অভ্যাস গড়ে দেয় পরিবার। ওজন নিয়ন্ত্রণেও পরিবারের ভূমিকা অনেক। এর সঙ্গে জরুরি হলো শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা। পরিবারে বাবা ছেলেমেয়েদের নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেন, সাইকেল কিনে দেন, বাজার করতে নিয়ে যান বা বাগানে কাজ করেন। কায়িক শ্রমের বেলায় পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্ব রাখে।

পরিবারে যখন ডায়াবেটিস
যার ডায়াবেটিস হয়েছে তাকে ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। তার জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিছুই আর হবে না—এই মনোভাব থেকে সরে আসতে হবে। জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনা ছাড়া তার যে আর কিছুই হারাবার নেই এ বিষয়ে আশ্বস্ত করুন। তার সঠিক ডায়েট চার্ট বজায় রাখতে সাহায্য করুন। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামের জন্য তাকে পারিবারিক কাজের বাইরে দৈনিক অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় বের করতে সাহায্য করুন। সবাই মিলে কোথাও খেতে গেলে বা ঘুরতে গেলে খাদ্য নির্বাচনের সময় তার কথা খেয়াল রাখুন। তার ওষুধপত্তর বা ইনসুলিন আছে কি না, খোঁজ নিন।
সপ্তাহে এক দিন গ্লুকোমিটারে শর্করা পরীক্ষা করার বিষয়টি সবাই শিখে নিন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেবল রক্তে শর্করার অবস্থা জানার জন্যই নয়, হঠাৎ রক্তে শর্করাস্বল্পতার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে এই একটি পরীক্ষা করেই আপনি তার জীবন বাঁচাতে পারেন। একজন ডায়াবেটিস রোগীর নিয়মিত কিডনি, চোখ ও আরও কিছু চেকআপের প্রয়োজন পড়ে। সময়মতো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এগুলো করে নিতেও পরিবারের ভূমিকা রাখা দরকার। পরিবারের অবহেলা একজন ডায়াবেটিস রোগীকে নানা জটিলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও নারীর পরিবার
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তরুণীরা প্রথমে খুবই ঘাবড়ে যান, ইনসুলিন নিতে ভয় পান ও সন্তানের সুস্থতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর নিজের ও স্বামীর পরিবারের সমর্থন খুব দরকার। পুরো দশ মাস ঠিকভাবে ইনসুলিন নেওয়া, বারবার রক্তে শর্করা মাপা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে চেকআপ করতে যাওয়ার জন্য সহায়তা পেলেই কেবল তিনি ও সন্তান সুস্থ থাকতে পারবেন। আবার সন্তান জন্মের পর সবাই যখন নবজাতককে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন মায়ের কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। সন্তান প্রসবের পরও যত্ন–আত্তি দরকার, ঘা ঠিকভাবে শুকালো কি না, রক্তে শর্করা নেমে এল কি না, ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে আবার গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট করা হলো কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা চাই। পরবর্তী সন্তান জন্মের পরিকল্পনা নেওয়ার সময়ও পরামর্শ দরকার হবে তাঁর।

শিশুদের ডায়াবেটিস ও পরিবার
শিশুরা মূলত টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। যেকোনো বয়সের শিশুরই হতে পারে এটি। এই শিশুদের বিশেষ যত্ন দরকার হয়। নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়া ও হাইপোগ্লাইসেমিয়া যাতে না হয়, সঠিক বৃদ্ধি ও বিকাশ যেন হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।