Foto

নতুন বছরে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা


নতুন বছরের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। একটা প্রত্যাশা ছিল, শান্তিপূর্ণ একটা নির্বাচন আমরা পাব। নির্বাচন হয়েছে, খুব শান্তিপূর্ণ হয়নি।


নির্বাচনে ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। সে হিসেবে বছরের শেষে কিছু বেদনা নিয়ে আমরা আগামী বছর শুরু করছি। মহাজোট আবার ক্ষমতায় আসছে। কাজেই কিছু কিছু প্রত্যাশা তাদের কর্মকাণ্ড ঘিরে থাকবে।

অতীতের তুলনায় তাদের অনেক বেশি সক্রিয়তা দেখাতে হবে। না হলে অন্তত শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে থাকব, আমরা প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারব না।

প্রত্যাশার অনেক দিক আছে। একটা হচ্ছে সামাজিক প্রত্যাশা। সেটি হল সমাজে যেন শান্তি বজায় থাকে। নির্বাচন-পরবর্তী হানাহানি যদি হয়, সহিংসতা ও প্রতিশোধের রাজনীতি আবার শুরু হয়, তাহলে প্রচুর পরিবার নিঃস্ব হবে এবং আমাদের অগ্রগতি ব্যাহত হবে।

মহাজোট সরকার গঠন করবে। এ সরকারের উচিত হবে নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারেও অনেক সুন্দর সুন্দর কথা উল্লেখ আছে- সেসব কথা বিবেচনায় রেখে যে জোটটি হেরেছে তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রেখে মহাজোটের প্রশাসন পরিচালনা করা উচিত।

তাহলে আমি বলতে পারব যে, আমাদের প্রত্যাশাগুলো পূরণের জন্য একটি ভূমি তৈরি হয়েছে।

আগামী বছরের আরেকটি প্রত্যাশা হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা যেন আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং আমাদের অর্জনের জায়গাগুলো ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে। এক সময় আমরা গার্মেন্ট সামগ্রী রফতানি করে আমাদের রফতানি খাতের ভাণ্ডার পূর্ণ করতাম এবং আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এখন তো অনেক ধরনের পণ্য রফতানি হচ্ছে, রফতানির বাস্কেটটা আরও বিচিত্র করতে হবে এবং বাড়াতে হবে। বর্তমানে যেসব পণ্য রফতানির তালিকায় নেই- সেখানে এমন কিছু পণ্য সংযুক্ত করতে হবে। যেমন আমাদের কৃষি খাত- আমাদের দেশের ফুল রফতানি হচ্ছে, সেটির পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হবে।

আমাদের দেশের ফল রফতানি হচ্ছে, সেটির পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া যেসব খাতে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, সেসব খাতে উৎপাদন আরও বাড়ানো দরকার, যাতে আমরা ওইসব পণ্যও রফতানি করতে পারি।

উৎপাদনের সব খাতে যেন আমাদের অগ্রগতি হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সব খাতেই যেন আমাদের অগ্রগতি হয়, তার জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরেকটি প্রত্যাশা হল, যেসব বড় প্রকল্প এখন চলমান রয়েছে, সেসব যতটা সম্ভব দ্রুত শেষ করা দরকার যাতে জনদুর্ভোগ না হয়। যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল- আমাদের প্রত্যাশা এগুলো আগামী এক-দুই বছরের মধ্যেই যেন শেষ হয়।

একটি বড় প্রত্যাশা থাকবে দুর্নীতি শূন্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়ে। হয়তো সেটি সম্ভব হবে না। কিন্তু যতটা কমানো সম্ভব ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহাজোট সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে; শূন্য সহনশীলতার নীতি কাজে প্রমাণ করতে হবে। দুর্নীতি নির্মূলে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশের হতদরিদ্র ও দরিদ্র মানুষের জীবনমানে যাতে দ্রুত পরিবর্তন আসে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সর্বত্র দ্রুত পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমি আশা করব, সরকার স্বাস্থ্য খাতে অনেক বেশি বরাদ্দ দেবে।

বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রামের মানুষ যাতে স্বল্প খরচে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পায় তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমাদের দেশের উন্নয়নের প্রসঙ্গ এলে স্বাভাবিকভাবেই এসডিজির প্রসঙ্গটিও এসে যাবে। এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শিক্ষা খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ। আগামী বছরের বাজেটে যদি ০.৫ শতাংশ বাড়ানো না হয়, অর্থাৎ নতুন সরকারের পাঁচ বছরে যদি ২.৫ শতাংশ বাড়ানো না হয়, তাহলে শিক্ষা খাতে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায় শিশু ও নারীর জীবনমান উন্নয়নের কথাও উল্লেখ আছে। বস্তুত শিক্ষা খাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিলে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। মানসম্মত শিক্ষা না থাকলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে না।

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে নারীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পাশাপাশি চলতে হবে। নারীর কর্মক্ষেত্রে পরিসর ও বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। আমি খুব আনন্দিত হব, আমাদের দেশের নারীরা যদি শিক্ষা গ্রহণ করে বিজ্ঞানী হতে পারেন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে যদি বড় পদে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

নারীর একটি ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্র। আমি দাবি করছি, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি বাড়ানো হোক। এটি হচ্ছে বিনিয়োগ। এটি খরচ নয়। প্রতিটি বিনিয়োগের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া যায়।

শিক্ষাক্ষেত্রে বেশি বিনিয়োগ করলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ- তিন মেয়াদেই ফল আসবে। উচ্চশিক্ষা শেষে একজন নারী যদি প্রাথমিকের চাকরি বেছে নেন, প্রাথমিকের চাকরি যদি আকর্ষণীয় হয়, তাহলে মেধাবীরাও প্রাথমিকের চাকরি নিতে আগ্রহী হবে। তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দ্রুত উন্নতি হবে।

২০১০ সালের শিক্ষানীতি যদি বাস্তবায়ন না করা হয় এবং পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর দুটি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা চলতে থাকে- মুখস্থনির্ভর সনদমুখী এ শিক্ষা এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে না। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক শিক্ষা শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য সক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে।

মুখস্থবিদ্যা কখনও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে না। যার জন্য আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক ভারতীয় ও অন্যদেশীয় দক্ষ কর্মী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তারা বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা চাই সেখানে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ। প্রতিযোগিতার বিশ্বে এগিয়ে থাকার জন্য সর্বক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ মান অর্জন করতেই হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মহাকাশে একটি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। এটি একটি সুখবর। আমি আরও খুশি হতাম যদি স্যাটেলাইটটি আমাদের দেশেই তৈরি হতো। প্রাথমিক থেকেই যদি আমাদের শিক্ষার্থীদের মান বাড়াতে না পারি পরবর্তী সময়ে তা সম্ভব হয় না।

শিশুদের প্রচুর বিনোদনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শিশুশ্রেণী থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সৃজনশীল হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

দুর্নীতির জন্য দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ