Foto

ধানের শীষের প্রার্থীরা ট্রাইব্যুনালে মামলা করছেন


জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে দলগতভাবে নয়- নিজ উদ্যোগে মামলা করবেন বিএনপির প্রার্থীরা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের অনেক প্রার্থীও স্বতন্ত্রভাবে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ধানের শীষের এই প্রার্থীরা মামলা করবেন বলে জানা গেছে।


ইতোপূর্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষিত কর্মসূচিতে বলা হয়েছিল, দলগতভাবে একত্রে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে। কিন্তু ’বিদ্যমান বাস্তবতায় ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না’- দলের পরামর্শকদের এমন মতামত আমলে নিয়ে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিএনপি। তবে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিজ উদ্যোগে প্রার্থীদের কেউ মামলা করতে চাইলে তা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে দলের কোনো আপত্তি থাকবে না। পাশাপাশি ’নির্বাচনী অনিয়ম’গুলো জাতিকে জানানোর জন্য প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণসহ ’শ্বেতপত্র’ প্রকাশের এবং ভিডিও ফুটেজের সিডি প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ দল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, নির্বাচনের অনিয়মের পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ ও চিত্র তাদের হাতে আছে। ধানের শীষের প্রার্থীরা তাদের এলাকার নির্বাচনী বিরূপ পরিবেশ ও অনিয়মের চিত্র ইতোমধ্যে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। কিন্তু বিচার বিভাগের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। তাই দলীয়ভাবে মামলা করা হবে না।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করা নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা কাউকে নিষেধ করেননি। নিজ উদ্যোগে কেউ মামলা করতে চাইলে তা করতে পারবেন।

নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার আইনি দিক প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, নির্বাচন পরিচালনা বিধি ২০০৮-এর ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনী ফলের গেজেট প্রকাশের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। ২ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ আসনের ফলের গেজেট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে। সে হিসাবে বাকি সময়ের মধ্যে মামলা করতে হবে।

দলগতভাবে মামলা করার সিদ্ধান্ত থেকে বিএনপি পিঠটান দিলেও নিজ উদ্যোগে বেশিরভাগ ধানের শীষ প্রার্থীই মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা বলছেন, যতই পক্ষপাতিত্ব করুক, তাদের দেওয়া তথ্য-প্রমাণকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। এলাকায় প্রতিটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোটের তালিকায় অনেক মৃত, দেশের বাইরে অবস্থানকারী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের নামে দেওয়া ভোটের হিসাব দেখতে গেলেই প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে। ভোটারদের ভোট দেওয়ার ব্যালট বই জব্দ করা হলে এবং তার ওপর বিচারকার্য পরিচালনা হলে তারা ন্যায়বিচার পাবেন। কোনো কারণে ন্যায়বিচার না পেলেও এলাকার ভোটারদের কাছে তাদের অধিকারের জন্য আইনি লড়াই করার বিষয়টি দৃশ্যমান হবে। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ধানের শীষের একাধিক প্রার্থী।

মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এমন একজন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী রুমানা মাহমুদ। এ প্রসঙ্গে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সমকালকে বলেন, মামলার জন্য আইনজীবীর কাছে কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তার মামলা সচল হবে। তিনি মনে করেন, যেভাবে মৃত ভোটাররা ভোট দিয়েছেন, তাতে ৩০০ আসনের প্রার্থীদেরই মামলা করা উচিত। ব্যালট বইয়ের মাধ্যমে তারা সব প্রমাণ করতে পারবেন।

মামলা করার বিষয়ে বরিশাল-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মামলা করবেন তিনি। এ জন্য তার প্রস্তুতিও রয়েছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও ন্যায্য অধিকারের জন্য একদিকে রাজপথের লড়াই যেমন চলবে, তেমনি আইনি লড়াইও করা হবে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ জানান, তিনি তার একটি কেন্দ্রের ভোটের ফলাফল নিয়ে মামলা করবেন। ওই কেন্দ্রের মৃত ১১ জন ভোটার কীভাবে ভোট দিয়েছেন, তা জানতেই তিনি মামলা করবেন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদসহ অন্যান্য প্রার্থীও মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মামলা করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। বিধি অনুযায়ী নির্বাচনী ফলের গেজেট প্রকাশের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়। গত সোমবার হাইকোর্ট ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট শাখায় তিনি ফাইল জমা দিয়েছেন। মামলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটা সিভিল কোর্টের মতো। ফাইল করার পর নোটিশ যাবে। একদম সিভিল কোর্ট প্রসিডিউর। এখানে সরাসরি কিছু নেই।

তবে অনেক প্রার্থী মামলা করার বিষয়ে উৎসাহ পাচ্ছেন না বলেও জানিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটের শরিক ও কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম জানিয়েছেন, মামলা করবেন না। তিনি চট্টগ্রাম-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন।

৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট অভিযোগ করে, নির্বাচনে ’ব্যাপক অনিয়ম’ ও ’ভোট কারচুপি’ হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোট। পরে মামলার বিষয়ে ধানের শীষের প্রার্থীদের পাশাপাশি দলের সিনিয়র আইনজীবীদের কাছ থেকে মতামত নেয় বিএনপি। অধিকাংশ আইনজীবী মামলা করার বিপক্ষে মত দেন। তাদের মতে, বিদ্যমান বাস্তবতায় এসব মামলায় রায় সরকারের পক্ষে যাবে। বরং আইনিভাবে ৩০ ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। সরকার আরও একটি আইনি সমর্থন পাবে। তবে কেউ কেউ মামলা করার পক্ষেও মত দেন। তারা বলেন, মামলার রায় যাই হোক না কেন, একটা ডকুমেন্ট থাকবে, যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ব্যক্তি উদ্যোগে প্রার্থীরা মামলা করলে তার ফলাফল নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে না।

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, তারা ভেবেচিন্তে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএনপির নীতিনির্ধারকদের। তবে প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগে মামলা করলে এর দায় বিএনপি বা জোটের ওপর পড়বে না বলে সে ক্ষেত্রে কাউকে নিরুৎসাহিত করা হয়নি।

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ