Foto

ধানের অর্ধেক দামও পাচ্ছেন না কৃষক


কৃষকের উঠানে-মাঠে সোনারঙা বোরো ধানের গড়াগড়ি। কৃষকের মুখে হাসি। বাজারে গিয়ে কৃষকের সে খুশি উবে যাচ্ছে। মুহূর্তেই মলিন কৃষকের মুখ। চালকল মালিক ও সরকারি গুদামে ধান না কেনার কারণে ধানের ভয়াবহ দরপতন চলছে। আমনের পর এবার বোরো ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ কৃষক। কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে ব্যাপারী ও ফড়িয়ারা। ব্যাংক ঋণ না মেলায় চাতালকল মালিকরাও ধান কিনছেন না।


মৌসুমের শুরুতেই পড়তি দামের তেতো অভিজ্ঞতায় বিরক্ত কৃষক। লোকসানের গ্যাঁড়াকলে কৃষক উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও পাচ্ছেন না ধানে। এর আগে গত আমন মৌসুমেও কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি। ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকা মণে শুকনো আমন ধান বিক্রি হয়েছে।

এ বছর এক বিঘা বোরো জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১৫ মণের মতো। প্রতি মণ ধান ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষক পেয়েছেন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় কৃষকের লোকসান ৬ হাজার ২শ’ টাকা।

মাঠের পর মাঠ পাকা ধান। ঝড়-বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি শুরু হলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কৃষকের। গোলায় ধান তুলতে ব্যস্ত কৃষক। চড়া পারিশ্রমিকেও মিলছে না ধান কাটা শ্রমিক। অথচ এক সময় কৃষি শ্রমিকেরা সারা দিন ধান কেটে পাঁচ কেজি চাল পারিশ্রমিক হিসেবে নিতেন। এখন তারা ধান বা চাল নেন না; তারা টাকা নেন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ধান কাটার জন্য ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি নিয়ে থাকেন। দেখা যায় এক মণ ধান বেচেও কৃষক কৃষি শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে পারছেন না।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন চিকন ধান মাত্র ৫শ’ থেকে ৫৫০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও বাজারে নতুন ধান ৬শ’ থেকে ৬৫০ টাকা মণে বিক্রি হয়। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দর কমেছে ২৩ শতাংশেরও বেশি। নতুন ধান কেটে কৃষক বাজারে নিয়ে দেখেন, উৎপাদন খরচ আর দামের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। হিসাব কষে দেখেন, ধান চাষে লোকসানের পাল্লাই ভারি। এ ছাড়া বাজারে বেশি ধান ওঠায় দাম পড়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার কৃষকরা লোকসানের মুখে তাদের ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বগুড়ার গাবতলীর দড়িপাড়া এলাকার কৃষক জমির উদ্দিন জানান, ১০ দিন আগে তিনি বাজারে ৬০০ টাকা মণে ধান বিক্রি করলেও গত বুধবার একই ধানের দাম ৫শ’ টাকায় নেমে এসেছে।

ধান মাড়াই, বাছাই আর বিক্রি নিয়ে কৃষকরা দারুণ ব্যস্ত। দম ফেলার ফুরসত নেই। একদিকে ধান কাটা হচ্ছে, অপরদিকে সেই ধান ক্ষেতেই মাড়াই করা হচ্ছে। রাস্তায় ধান মাড়াই ও শুকানো হচ্ছে। সুনামগঞ্জ, মাগুরা, যশোর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, তারা ধানের দামে চরম ক্ষুব্ধ। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ডিঙ্গাপুতা বিলের কৃষক ও কৃষক সমিতির নেতা জয়নাল আবেদীন বলেন, পুরো ধানের বাজার এখন ফড়িয়াদের কবজায়। ফড়িয়ারা বাজারে গুজব ছড়াচ্ছে, সরকার বিদেশ থেকে বেশি চাল আমদানি করায় গুদামে জায়গা নেই। তাই এবার বেশি ধান-চাল কিনতে পারবে না। ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের কাছে দাবি জানাই। ধানের বাজার চাঙ্গা করতে দ্রুত ধান-চাল কেনার জন্য অনুরোধ করছি।

কৃষিশুমারি অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ৪৫ লাখ কৃষকের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড রয়েছে। সরকার ২ কোটি ৩০ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি করেছে। এর মধ্যে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কৃষিবিষয়ক পরার্মশক কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. শহীদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সাধারণত বছরের শুরুতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক বিক্রি করে কৃষি উপকরণের বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। অর্থাৎ যখন দাম কম থাকে তখন তাদের ধান বিক্রি করতেই হয়। পরে বছরের শেষদিকে গোলার ধান শেষ হলে তারা আবার বাজার থেকে চাল কিনে খান। তখন চালের দাম সবচেয়ে বেশি থাকে।

গত ২৭ মার্চ সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার জন্য মূল্য নির্ধারণ করেছে। পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে বোরো চাল ও ২৬ টাকা কেজি দরে বোরো ধান কেনা হবে। সরকারি হিসাবে এক মণ বোরো ধানের দাম ১ হাজার ৪০ টাকা হলেও এখন পর্যন্ত বাজারে দাম ৭শ’ টাকার বেশি ওঠেনি।

বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষক বাঁচাও ফোরামের মহাসচিব কৃষিবিদ ড. আনোয়ারুল হাসান বলেন, চালের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে ধানের দাম কমে যাচ্ছে। ধানের দরপতন ঠেকাতে চাল আমদানির ওপর শুল্ক্ক আরোপ করতে হবে। তা না হলে কৃষকরা বারবার ধান উৎপাদনে লোকসান গুনলে এক সময় তারা ধান উৎপাদন থেকে সরে যেতে পারেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ আবার সংকটে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ বলেন, গতকাল শনিবার পর্যন্ত সারা দেশে গড়ে ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সারা দেশের পুরো ধান কাটা শেষ হবে।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ফলন ভালো হলে দাম পড়ে যায়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা আমরা জানি। চাল রফতানি করে দাম বাড়ানো যায়। তবে এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারণ, হঠাৎ সংকট দেখা দিলে ভয়ঙ্কর বিপদ হবে। আমরা চিন্তা করছি কৃষকদের জন্য কিছু একটা করার। সারাদেশে বোরো ধান কাটা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে। ধানের দাম নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।

বগুড়া ব্যুরো : বগুড়ার বাজারে চিকন জাতের ধান ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ এবং মোটা জাতের ধান ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে। দাম কম হওয়ায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে (৩০ শতাংশ) ধান আবাদে এলাকাভেদে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়। অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২২ মণ ধান মিলছে। চিকন জাতের ২০ মণ ধান গড়ে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করলে মেলে ১৩ হাজার টাকা। আর মোটা জাতের ধান থেকে ১১ হাজার টাকার বেশি আসে না। এই হিসাবে চিকন জাতের ধান আবাদ করলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং মোটা ধানে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লাভ থাকছে। জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার জিয়ানগর ইউনিয়নের খিদিরপাড়া গ্রামের কৃষক আবু সাঈদ জানান, ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে কেটে ঘরে তোলা পর্যন্ত একজন কৃষক ও তার পরিবারে সদস্যদের শ্রমের মূল্য যোগ করলে যে দরে ধান কেনাবেচা হচ্ছে, তাতে কোনো লাভই থাকে না।

ময়মনসিংহ ব্যুরো : ফুলপুর উপজেলার চানপুর গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, কষ্ট করে ধান ফলিয়ে পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। ধান বাজারে পাইকারদের আচরণে ক্ষুব্ধ হতে হয়। এক মণ ধান ৫০০ থেকে ৫২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ একজন শ্রমিকের মজুরি এক হাজার টাকা।

ত্রিশাল উপজেলার কৃষক আব্দুল আজিজ জানান, সাড়ে ৬ শতাংশ (এক কাঠা) জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭শ’ টাকা। প্রতি কাঠায় ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ মণ। ফলে এখন ধান বিক্রি করলে প্রতি কাঠায় এক হাজার ৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কোথাও ধানের মণ ৪৫০ টাকা, আবার কোথাও ৬৫০ টাকা। সরকার ধান না কেনায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফড়িয়ারা ধানের দাম নির্ধারণ করছে।

কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, ব্রি ২৮ জাতের প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৫১০ টাকা এবং ব্রি ২৯ জাতের ধান ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বম্ভরপুরের কৃষক নেতা স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, মানুষ ধান নিয়ে রীতিমতো বিপদে পড়েছে। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন কৃষক।

হাওরাঞ্চলে ধানের সবচেয়ে বড় আড়ত মধ্যনগর বাজারে এখন দিনে ৯ থেকে ১০ হাজার মণ ধান কেনা হচ্ছে জানিয়ে ধানের আড়তদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় জানালেন, ব্রি ২৮ ধান ৬৭০ থেকে ৬৭৫ টাকা এবং ব্রি ২৯ জাতের ধান ৬৩৫ থেকে ৬৪০ টাকায় কিনেছেন তারা।

সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য ১০৪০ টাকা নির্ধারণ করে ২৫ এপ্রিল থেকে ধান কেনার নির্দেশ দিলেও জেলার কোথাও এখনও ধান কেনা শুরু হয়নি। সরকার সুনামগঞ্জ থেকে ধান কেনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তাও হাস্যকর।

কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জে ধানের উৎপাদন মূল্য দূরের কথা, ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে না পেরে বস্তায় ধান ফেলে রেখেছেন কৃষক। মূল্য কম থাকায় কৃষকরা দাদনের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। প্রতি মণ ধানের সর্বোচ্চ মূল্য ৫৫০ টাকা। শুকনো ধানের দাম সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। অথচ উৎপাদন ব্যয় ৭৫০ টাকা। প্রতিদিনের শারীরিক শ্রম যোগ করলে প্রতি মণ ধানের দাম পড়বে ৮১০ টাকা। প্রতিদিন কিশোরগঞ্জের চামড়াঘাট, কিশোরগঞ্জ বড় বাজার ও বৃহত্তর ভৈরব বাজারে হাজার হাজার মণ ধান আসছে। দাম না থাকায় কৃষক ধান বিক্রি করতে না পারায় চরম হতাশ।

ধান কাটতে কৃষি শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। কৃষকরা বলছেন, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে গড়ে ৮১০ টাকার মতো।

নেত্রকোনা : এক কাঠা জমিতে ৫ মণ ধান হয়েছে। প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকায়। অথচ এক কাঠা জমিতে ধানের আবাদ, কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকা খরচ হয়। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় না করায় ন্যায্যমূল্য থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। নেত্রকোনার অতিথপুর বাজারের ধান ব্যবসায়ী ইদ্রিস মিয়া বলেন, ক’দিন আগে ধান ছিল মণপ্রতি ৫শ’ থেকে ৫১০ টাকা। এখন ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা দরে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন :বগুড়া থেকে মোহন আখন্দ, ময়মনসিংহ থেকে মীর গোলাম মোস্তফা, কিশোরগঞ্জ থেকে সাইফুল হক মোল্লা দুলু, সুনামগঞ্জ থেকে পঙ্কজ দে ও নেত্রকোনা থেকে খলিলুর রহমান শেখ।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ