Foto

দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ হাইকোর্টের


অনিয়মের অভিযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য সংশ্নিষ্ট সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার এর দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এই মেগা প্রকল্পের শুরুতেই অনিয়ম নিয়ে গত ২ মার্চ সমকালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।


জানা গেছে, গত ১৪ মার্চ বিচারপতি তারিক উল হাকিম এবং বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিতের আদেশ দেন। দরপত্রে সরকারের ক্রয়- সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কারিগরি ইউনিটের (সিপিটিইউ) নির্দেশনা পালন করা হয়নি বলে রিটে অভিযোগ করা হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, সিপিটিইউর নির্দেশনা অনুযায়ী দরপত্রের বিধিবহির্ভূত শর্ত সংশোধন করে আইনসম্মত না করা পর্যন্ত এ দরপত্র প্রক্রিয়ার যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এ দরপত্র প্রক্রিয়ায় সিপিটিইউর নির্দেশনা প্রতিপালন না করায় সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন আদালত।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও এ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। গত ১৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৮ শামীম আলম স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত নির্দেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে এ প্রকল্পের অনিয়ম-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, দরপত্র আহ্বানের পর বিশ্বের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবকাঠামো নির্মাণকারী শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো অদ্ভুত শর্তের কারণে দরপত্র কিনতেই পারেনি। পরে এ নিয়ে সিপিটিইউতে অভিযোগ জমা দেয় তুরস্কের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান টিএভি ও গ্যাপইনসাত। কাতারের দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী ও দুবাই, তুরস্কের ইস্তাম্বুল, সৌদি আরবের রিয়াদ এবং নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিশ্বের ২২টি বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। এ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিমানবন্দর অবকাঠামো নির্মাণে লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাডি গ্রুপের তালিকায় এক নম্বরে অবস্থান করছে। টিএভি-গ্যাপইনসাতের অভিযোগে বলা হয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে প্রথমে দরপত্র বিক্রিতেই রাজি হয়নি।

এ অভিযোগ পর্যালোচনা করে গত ১৮ অক্টোবর সিপিটিইউ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয় বেবিচককে। চিঠিতে বলা হয়, কোনো পূর্ব শর্ত দিয়ে দরপত্র বিক্রি করা বিধিসম্মত নয়। একই সঙ্গে দরপত্রে কয়েকটি শর্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র নীতিমালা এবং সরকারি ক্রমবিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ কারণে এসব শর্ত সংশোধনের জন্য বলা হয়। সিপিটিইউ থেকে এ চিঠি পাওয়ার পর টিএভি-গ্যাপইনসাতের কাছে দরপত্র বিক্রি করে বেবিচক।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ৩১ জানুয়ারি বেবিচকের কাছে আবারও একটি চিঠি পাঠায় সিপিটিইউ। উপপরিচালক মাহফুজার রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে সিপিটিইউয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, যে কোনো প্রকল্পের দরপত্রের শর্ত তৈরিতে সরকারি ক্রয়বিধি এবং প্রকল্পের ঋণদাতা সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়ে থাকে। বেবিচকের এ প্রকল্পের দরপত্রে এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট ব্যত্যয় দেখা গেছে। সরকারি ক্রয়বিধি এবং দাতা সংস্থা জাইকার গাইডলাইন-বহির্ভূত শর্ত যুক্ত করার ফলে দরপত্রটি প্রতিযোগিতামূলক না হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, দরপত্রের শর্তে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার সনদের ক্ষেত্রে ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসের আগের আইএসও সনদ ১৪০০১ থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারি ক্রয়বিধি এবং দাতা সংস্থা জাইকার নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের শর্ত আরোপের সুযোগ নেই। দরপত্রের শর্তে কোন প্রতিষ্ঠানের কত বেশি হালনাগাদ সনদ আছে, সেটাই প্রযোজ্য হবে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে আইএসও সনদের আরও উন্নত স্তর স্থাপিত হয়েছে। আইসএসও সনদের স্তর ৪৫০০১ :২০১৮ পর্যন্ত এসেছে। কেন বেবিচকের দরপত্রে উন্নত স্তরের আইএসও সনদের পরিবর্তে ১৪ বছর আগের সনদ শর্ত হিসেবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়।

দরপত্রের একটি শর্তে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এর আগে জাইকার ঋণের প্রকল্পে এবং জি-৭ দেশে কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সিপিটিইউর চিঠিতে জাইকার গাইডলাইনে এ ধরনের কোনো শর্তের কথা নেই উল্লেখ করে বলা হয়, কত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা আছে, কতটি দেশে আছে এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতটা উন্নত সক্ষমতার প্রমাণ রয়েছে তা বিবেচনায় আসবে। বেবিচকের দরপত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় না এনে যোগ্যতার শর্তকে এমনভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, যার ফলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দর অবকাঠামো নির্মাণ কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে এ প্রকল্প গ্রহণের পর থেকেই জাপানের একটি কোম্পানি এ কাজ পাওয়ার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক সময় এ কোম্পানিটির বিমানবন্দর অবকাঠামো নির্মাণে খ্যাতি থাকলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। এ কারণে শাহজালাল বিমানবন্দর বর্ধিতকরণের কাজটি তাদের জন্য বড় একটা সুযোগ। আর এ কোম্পানিকে এই কাজটি পাইয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেই দরপত্রে কিছু অপ্রয়োজনীয় ও অদ্ভুত শর্ত যোগ করা হয়েছে। দরপত্রের এই শর্তগুলোকেই অনিয়ম হিসেবে বলা হয়েছে সিপিটিইউর পর্যবেক্ষণে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর আগে ২০১৫ সালের মে মাসে বিটিসিএলের একটি বড় প্রকল্পে অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর জাইকা প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ