Foto

তুরস্কে হ্যাশট্যাগ মি টু


নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি বা শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করার মতো সাহসী হতে পারেন না বেশির ভাগ নারী। এই সমাজ নারীর চুপ করে থাকাকেই পছন্দ করে।


তাই সামাজিক বলয়ে নিজেকে তথাকথিত সম্মানজনক অবস্থানে রাখতে নীরবে সব নির্যাতন সহ্য করাকেই ‘নিরাপদ’ ভাবেন এই নারীরা। তবে ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। দ্বিধা কাটিয়ে সাহসী নারীরা নীরবতা ভেঙে সোচ্চার হয়েছে হ্যাশট্যাগ মি টু (#Me Too) প্ল্যাটফর্মে।

বিশ্বজুড়ে তোলপাড় এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলনে শামিল হয়েছেন বহু নারী। বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ে পুষে রাখা ক্ষতের কথা বলে চলেছেন তাঁরা। সেই জোয়ারে সেভাবে না ভাসলেও তুরস্কও মুখ খুলতে শুরু করেছে। জনপ্রিয় তুর্কি কণ্ঠশিল্পী সিয়া গেনজোগলু টুইটারে লিখেছেন তাঁর গল্প। গত ১ নভেম্বর তিনি লিখেছেন, ‘নিজের অপমানের কথা প্রকাশ্যে বলা কখনোই খুব সহজ ব্যাপার না। কিন্তু আমি এও জানি, চুপ থাকার মধ্য দিয়ে আমার নিজের সঙ্গে, এ দেশের নারীদের সঙ্গে এবং যাঁরা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়।’ ওই লেখায় গেনজোগলু প্রেমিকের বিরুদ্ধে তাঁকে মারধর, মেঝেতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া এবং অ্যাশট্রে দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করার অভিযোগ করেছেন।

তবে গেনজোগলুর গল্প যেন তাঁর একার নয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে তুরস্কে নারী নিগ্রহের চিত্র। সেখানে এখনো নির্যাতনের শিকার নারীদের শেষ আশ্রয় ‘নীরবতা’।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টে বলা হয়েছে, তুরস্কে উদ্বেগজনকভাবে পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে চলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, তুরস্কে প্রতি পাঁচজন নারীর দুজন কখনো না কখনো তাঁদের সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। গেনজোগলুর মতো প্রকাশ্যে খুব নারীই আসেন সেসব নিয়ে অভিযোগ করতে। বেশির ভাগ ঘটনাই চাপা পড়ে যায়। গত বছর সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ৪০৯ জন। চার বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৩৭।তুরস্কের হাজেততেপে ইউনিভার্সিটি এবং পরিবার ও সামাজিক নীতিবিষয়ক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার তুর্কি নারীদের মাত্র ১১ শতাংশ বিচার চায়। অনেকেই মুখ ফুটে নির্যাতনের কথা বলেন না। কোথাও আশ্রয় চাইলে বা বিবাহবিচ্ছেদ চাইলে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে লজ্জায় পড়তে হবে বলে মনে করেন নির্যাতনের শিকার বেশির ভাগ নারী। এ ব্যাপারে ভাবনা এখনো অতীতেই আটকে আছে। একই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ৫৪ শতাংশ নারী মনে করেন, স্ত্রী প্রতারণা করছেন সন্দেহ হলে পুরুষেরা নির্যাতন করতে পারে, এটা দোষের না।

তুরস্কে বাড়ির বাইরে কর্মরত নারীর সংখ্যা বিগত দশকগুলোর তুলনায় বেড়েছে। যদিও অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক ৩৬ সদস্য দেশের সংগঠন দ্য অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) গড় হার থেকে তা এখনো প্রায় ২০ পয়েন্ট নিচে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের লিঙ্গবৈষম্যের তালিকাতেও তুরস্কের অবস্থান তলানিতে।

উই উইল স্টপ ফেমিসাইড সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা গুলসাম কাভের মতে, নিজের সম্পদ না থাকা ও চাকরির সুযোগ কম থাকায় নিপীড়ক স্বামীকে ছেড়ে আসতে চান না অনেক নারী।প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে একসময় নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হয়েছিল। তিনি একবার বলেছিলেন, তুরস্কের বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে নারী প্রতি সহিংসতা। তাঁর সরকার পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে নারী সদস্যদের হত্যার ক্ষেত্রে সাজা কমানোর বিধান বাতিল করে। ২০১২ সালে নতুন আইন করা হয়, যাতে বিবাহিত, অবিবাহিত সব নারী তাঁর নিপীড়ক সঙ্গীর বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে পারবেন। এমনকি নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয় দেওয়া ও চাকরির প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন আইনে। এরপরও আইনের আওতায় মাত্র ২৩ শতাংশ নারী বিচার চেয়েছেন।

তবে প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্রমাগত দাবির মুখে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আগের অবস্থান থেকে সরে এলেন। তাঁর দল এমন বিল পাস করতে চাইছে, যাতে ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে বিয়ে করলে ধর্ষকের সাজা মওকুফের সুযোগ থাকবে। সরকার শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আগামী পাঁচ বছরে বাড়ানোর অঙ্গীকার করলেও তা আদতে এগোয়নি। এরদোয়ানের ১৭ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে নারী মাত্র দুজন। তুরস্কের গণতন্ত্র এখনো নারী আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে এরদোয়ান নতুন প্রচার শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যে গত ২৫ নভেম্বর ইস্তাম্বুলে নারী বিক্ষোভকারীদের প্রতি কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছে পুলিশ। দেশজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন ওই নারীরা।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ