Foto

ট্র্যাজিক হিরো হয়েই থাকলেন লিটন


আউট না নট আউট? ‘বিহাইন্ড দ্য লাইন’ ছিলেন না। মানে দাগের পেছনে ছিলেন না। ছিলেন ‘অন দ্য লাইন’। এ কারণেই ‘বেনেফিট অব ডাউট’ শব্দটা ঘুরেফিরে আসছিল বারবার। কিন্তু বেনেফিট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আম্পায়ার খুঁজে পাননি, যেমনটা পাননি তাঁর সতীর্থরাও! টপ অর্ডার নিয়ে কত কথা! তাসের ঘর, মুড়ি-মুড়কি, আত্মঘাতী—টপ অর্ডার নিয়ে কথা বার্তায় এই শব্দগুলোই বেশি উচ্চারিত হয়েছে; এই এশিয়া কাপে। ফাইনালের আগে এ কথায় কোনো ভুল ছিল না।


কিন্তু ফাইনালে? আগের পাঁচ ম্যাচ বিবেচনায় এ তো স্বপ্নের শুরু! যে স্বপ্নের প্রধান সারথি ছিলেন লিটন দাস। অথচ শেষটায় তিনি ট্র্যাজেডিএর শিকার। না, স্ট্যাম্পিং নিয়ে কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে এত অসাধারণ একটা ইনিংস খেলার পথে সতীর্থদের অমন বিবাগি হয়ে যাওয়া নিয়ে।

বাংলাদেশ ৫০ ওভার খেলতে পারেনি। অলআউট হয়েছে ২২২ রানে। এর মধ্যে লিটন-মিরাজের উদ্বোধনী জুটিতেই এসেছে ১২০। লিটনের ১২১ রান বাদ দিলে দলীয় স্কোরবোর্ডে বাকি ১০জনের মোট অবদান মাত্র ৯৪! এটাই লিটনকে ট্র্যাজেডিএর শিকার বানিয়ে দিচ্ছে। সতীর্থদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্যটুকু পেলে দলের স্কোর ২৮০ টপকে যেতে পারত। তখন ওভাবে আউট হওয়ার আক্ষেপটা আর থাকত না লিটনের। কিন্তু বাংলাদেশ দলের ফাইনাল খেলা থেকে আক্ষেপ শব্দটা ঘুচল কোথায়!

আজ কিন্তু সেই ইঙ্গিত ছিল। অবশ্যই লিটনের ব্যাটে। দর্শনীয় স্ট্রোক খেলতে পারেন, রেশমি সব ড্রাইভ—ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন কথা লিটনকে নিয়ে বহু উচ্চারিত হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক ময়দানে তিনি অনূদিত করতে পেরেছেন খুব কমই। এই এশিয়া কাপে আগের পাঁচটি ম্যাচই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু লোকে ভুলে গিয়েছিল, মঞ্চ বড় হলে লিটনের ব্যাটও চওড়া হয়ে ওঠে। এ বছরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিষ্পত্তির ম্যাচে খেলেছিলেন ৬১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। সেই লিটনকে আজ দেখা গেল আরেকটু খোলতাই চেহারায়—ময়ূর পেখম ছড়ালে যতটা সুন্দর, ততটাই মাধুর্য ছিল তাঁর বাহারি সব স্ট্রোকে।

ওপেনিং জুটিতে লিটনের সঙ্গে মেহেদী হাসান মিরাজকে পাঠিয়ে ফাটকা খেলেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। মিরাজের ব্যাটিং দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, শুরুতেই পতনের মিছিল ঠেকানোই লক্ষ্য। অন্য প্রান্তে রানের চাকা সচল রাখার গুরুদায়িত্বটা পালন করেছেন লিটন। শুরু থেকেই খেলেছেন আত্মবিশ্বাস আর স্ট্রাইক অদল-বদল করে। চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে জাসপ্রীত বুমরাকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারা প্রথম চারটি তাঁর ইনিংসের প্রতিচ্ছবি হতে পারে। পরের ওভারে ভুবনেশ্বরকে মারা হুক শটটা, আহা! ছবির মতো সুন্দর। ঠিক তার পরের ডেলিভারিতেই কবজির মোচড়ে ফাইন লেগ দিয়ে চার মেরে লিটন যেন বুঝিয়ে দেন আজকের দিনটা শুধু তাঁর।

হয়নি। দিনটা তাঁর হতো যদি দলীয় ইনিংসটাও সন্তোষজনক অবস্থানে থাকত। এ যেন পাশাপাশি বিপরীত দুটি ছবি। লিটনের উল্টো পথে হেঁটেছেন তাঁর সতীর্থরা। বুমরা, ভুবনেশ্বর, চাহাল, যাদবদের স্বাভাবিক ছন্দে খেললে যে তাঁরাও ঢোঁড়া সাপ হয়ে যান তা বোঝা গেছে লিটনের ব্যাটিংয়ে। কিন্তু তাঁর সতীর্থদের ব্যাটিংয়ে ছিল উল্টো ছবি—১১৭ বলে ১২১ রানের ইনিংসের পাশে বাকি ১০ জনের ১৭৪ বলে ৯৪। আরেকটু খোলাসা করা যাক। মিরাজের ৩২ ও সৌম্যর ৩৩ বাদ দিলে বাকি ৮ জন মিলে ২৯!

অথচ শুধু লিটনের দুরন্ত ব্যাটিংয়ের জন্যই শুরুর চেহারাটা অন্যরকম ছিল। শুধু অন্যরকম বললে ভুল হবে, এবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের এমন শুরু কে ভেবেছে! সেটাও আবার ফাইনালে। ২১তম ওভারের পঞ্চম বলে মিরাজ আউট হওয়ার আগে দলীয় স্কোর ১২০। এ সময় ব্যাটিংয়ের মাস্তুলটা যে লিটনের হাতেই ছিল তা পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার—প্রথম ১০ ওভারে ৬৫ রান তুলেছে বাংলাদেশ। এখানে লিটনের একার অবদানই ৪৭। পরের ১০ ওভারে এসেছে ৫১—যেখানের লিটনের অবদান ৩৮। এই পথে লিটন তুলে নেন ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে ফাইনালে দ্বিতীয় দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি (৩৩ বলে)।

এমন অকল্পনীয় সুখ জাগানিয়া শুরুটা এনে দিলেন যিনি, তাঁকে সতীর্থরা কেমন সাহায্য করেছে তা বোঝা যায় পরের ১০ ওভারে (২১-৩০)। রান উঠেছে ৩১, উইকেট পরেছে ৪টি। যেখানে লিটনের একার অবদানই ১৬। অন্য প্রান্তে সতীর্থরা যাওয়া-আসার মিছিল শুরু করায় ওয়ানডেতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েও খোলসে ঢুকে গিয়েছিলেন লিটন। ইনিংসটা যত দূর সম্ভব টানতে যে হবে! শেষ পর্যন্ত মহেন্দ্র সিং ধোনির অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতার কাছ হার মানতে হয়েছে।

কিন্তু লিটনের আসল হার তো তাঁর সতীর্থদের কাছে। অপর প্রান্ত থেকে একটু সাহায্য পেলে ওয়ানডে ফাইনালে বাংলাদেশি কোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরিটা যে আরও রঙিন হয়ে উঠত। তা যেমন হয়নি তেমনি আউট হওয়া নিয়ে উসকে ওঠা বিতর্কে এই ম্যাচে লিটনের অসাধারণ স্ট্রোক প্লে যে ঢাকা পড়বে তা মোটামুটি নিশ্চিত। আমরা তো জিতলে নায়ক আর হারলে অজুহাত খোঁজা ক্রিকেটপ্রেমী। ট্র্যাজিক হিরোদের কজন খুঁজি?

Facebook Comments

" ক্রিকেট নিউজ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ