Foto

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আস্থার সংকট


আশা পূরণে এ পর্যন্ত কোনো ভূমিকা রাখতে না পারায় আস্থার সংকটে পড়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। রাজনৈতিক এই জোটের সবচেয়ে বড় দল বিএনপিতে ফ্রন্ট টিকিয়ে রাখার যুক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ জন্যই ঐক্যফ্রন্টের সর্বশেষ কর্মসূচি গণশুনানিতেও তেমন সাড়া মেলেনি।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের পর থেকে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়তে থাকে। স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকগুলোতেও বিএনপির নেতাদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়নি। একটি বৈঠকে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিই ছিলেন না। আরেকটি বৈঠকে বিএনপির উপস্থিত ছিলেন শুধু ড. আবদুল মঈন খান। এছাড়া কিছুদিন আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মানববন্ধনে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে কেবল তাকেই দেখা যায়।

জানা যায়, রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। পরে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. আবদুল মঈন খানকে যুক্ত করা হয় স্টিয়ারিং কমিটিতে। কিন্তু ড. মঈন খানকে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচিতে দেখা গেলেও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এখনো কোনো বৈঠকে যোগ দেননি।

এদিকে গত শুক্রবার ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানির কর্মসূচিতেও সাড়া মেলেনি বললেই চলে। সবকটি আসনের প্রার্থীদের গণশুনানিতে অংশ নেয়ার জন্য বলা হলেও বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতার পাশাপাশি অধিকাংশ প্রার্থীই শুনানিতে যাননি। ধানের শীষের প্রার্থীদের বাইরে নির্বাচনে অংশ নেয়া আরও ১৮টি দলের নেতাদের গণশুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বিপস্নবী ওয়ার্কার্স পাটি, গণতান্ত্রিক বিপস্নবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণসংহতি আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো দলের নেতাই কর্মসূচিতে যোগ দেয়নি। আর বিএনপির বাইরে ২০ দলীয় জোটের মাত্র ৪টি দলের নেতারা অংশ নেয় গণশুনানিতে।

জানা যায়, নির্বাচনে ঐক্যফন্টের কিছু ভূমিকার কারণে অনেকে যোগ

দেয়নি গণশুনানির কর্মসূচিতে। আর যোগ দেয়া অনেকের মধ্যেও ছিল ক্ষোভ। নির্বাচন অনিয়মের শুনানির চেয়ে নিজেদের কি দুর্বলতা ছিল তার শুনানির প্রয়োজন বলেও দলের অনেকে মতো দিয়েছেন। এছাড়া চকবাজার ট্র্যাজেডির কারণে অনেকে গণশুনানির পৌঁছানোর কথা বলেছিল। তাতেও রাজি না হওয়ায় অনেক প্রার্থী ক্ষোভে যোগ দেয়নি।

ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যত নিয়ে বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, তারা ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান। তাদের অভিযোগ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গেলেও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা শুধু ভোটেই মনোযোগী ছিলেন। ফ্রন্টের অনেক প্রার্থী বেগম জিয়ার মুক্তি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তিসংবলিত লিফলেটও তারা বিতরণ করেননি। এ নিয়ে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীর মধ্যে অনেক প্রশ্ন ছিল। কোথাও কোথাও বিএনপি নেতাকর্মীরা ফ্রন্ট নেতাদের প্রচারণায় পাশে পাননি। নির্বাচনোত্তর অবস্থায় এই ফ্রন্টের কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীর।

বিএনপি সূত্রগুলো বলছেন, ঐকফ্রন্ট নিয়ে যে আশা ছিল তার একটিও পূরণ হয়নি। সঙ্গত কারণে এই ফ্রন্ট টিকিয়ে রাখার যুক্তিকতা নিয়েও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে। ফ্রন্টে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে সূত্রগুলো মতে হচ্ছে, নেতা নির্বাচন, কাকে কয়টি আসনে ছাড়সহ ফ্রন্ট নেতারা যে পরামর্শ দিয়েছিল সব রেখেছে বিএনপি। পক্ষান্তরে বিএনপির যে কোনো পরামর্শই রাখতে নানা প্রশ্ন তুলেছে ফ্রন্ট নেতারা। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বেগবান করার বিষয়ে আন্তরিকতা দেখায়নি, নির্বাচনের আগে হরতাল, নির্বাচন কমিশন ঘেরাওসহ কয়েকটি আন্দোলনের প্রস্তাব দিলেও কর্মসূচিতে যেতে রাজি হয়নি ফ্রন্ট নেতারা। আর নির্বাচনের পরেও কোনো কর্মসূচিতে যেতে চায়নি। শুরুতে ট্রাইবু্যনালে মামলা এবং নাগরিক সংলাপের কর্মসূচি দিলেও তা বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখায়ানি। আর কর্মসূচিগুলোর জন্য একের পর এক তারিখ পরিবর্তন করে পুরো বিষয়টিকে সাধারণ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এছাড়া বিতর্কিত একটি নির্বাচন হওয়ার পরেও সংসদে যাওয়া নিয়ে ফ্রন্টে সিদ্ধান্ত মানতে চাচ্ছে না গণফোরামের দুই প্রার্থী।

তবে ঐক্যফ্রন্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, শীর্ষ নেতার অবর্তমানে দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এজন্য নির্বাচনের বিপর্যয়ের সব দায় ঐক্যফ্রন্টের কাঁধে দেয়ার ষড়যন্ত্রও হচ্ছে। বড় দল হিসেবে আন্দোলন সফলের দায়িত্ব ছিল বিএনপির। নির্বাচনের আগে ধানের শীষের প্রার্থীর ওপর হামলা এবং প্রচারণায় বাধা দেয়ার কারণে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পরামর্শ ঐক্যফ্রন্ট নেতারাই বিএনপিকে দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মতানৈক্য তা হয়নি। এই মতানৈক্য ও কোন্দল শুরু হয় মূলত নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়াকে কেন্দ্র করে। মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন পরিচালনাসহ সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদেরকে মনোনয়নের কোনো প্রক্রিয়াতে না রাখায় নির্বাচনী দায়িত্ব তারা আন্তরিকতার সাথে পালন করেনি। এছাড়া নেতাদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না। সিনিয়র নেতারা নিজের নির্বাচনী এলাকা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এসব কারণে বিপর্যয় হয়। এখন এর দায় ঐক্যফন্টের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে।

ঐক্যফ্রন্টের এই সূত্রটি আরও দাবি করে বলেন, মূলত দুটি কারণে নির্বাচনের আগেই বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। কারণ দুটি হচ্ছে, জামায়াতের ২২ প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেয়া এবং আন্দোলনের কোনো বিষয়ে বিএনপির আন্তরিকতা না দেখানো। আর নির্বাচনের পরে দুটি কারণে বিএনপির সঙ্গে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। এগুলো হচ্ছে, জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গণফোরামের দুই বিজয়ী প্রার্থীর সংসদের শপথ নেয়ার ইচ্ছা এবং ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির নেতা ডা. জাফরুলস্নাহ চৌধুরীর তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর প্রকাশ্যে পরামর্শ দেয়া। নির্বাচনের আগে ও পরের এই চারটি কারণ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট শীর্ষ নেতাদের মনোমালিন্য হয়নি। অথচ ঐক্যফ্রন্টে শীর্ষ নেতাদের অনিচ্ছার কারণে আন্দোলন হচ্ছে না বলে প্রচার করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, ফ্রন্টের অভ্যন্তরে নির্বাচন বিপর্যয়ের জন্য একে অপরকে ঘায়েলের জন্য দোষারোপের রাজনীতি চলছে। ফ্রন্টের হাইকমান্ডের কাছে নানা জবাবদিহতা চাওয়া হচ্ছে। গত শুক্রবার গণশুনানিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের জনসমর্থন ছিল শতভাগ। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা কিছু করতে পারেননি কেন, তা জানা দরকার। তার জন্য আরেকটি গণশুনানি বা সমাবেশ দরকার। কেন কিছু করা গেল না তার জন্য ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের কাছে জবাবদিহি চান তিনি।

শুধু উচ্চপর্যায়েই নয় বিএনপির অধিকাংশ পর্যায়েই ঐক্যফ্রন্টের ওপর আর আস্থা রাখা যাচ্ছেনা বলে মত দিচ্ছেন। এবিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তে ঐক্যফ্রন্টেরই ভূমিকা ছিল। শীর্ষ নেতাদের কাছে নির্বাচনের বিষয়ে যে তথ্য ছিল, তা কোনোটিই সঠিক হয়নি। তাহলে কারা নেতাদের বিভ্রান্ত করল, কাদের স্বার্থে নির্বাচনে অংশ নিল এসব প্রশ্ন এখন সবার। সবমিলে ঐক্যফ্রন্টের কর্মকান্ডে এখন আর আস্থা রাখা যাচ্ছে না বলেও মত দেন তিনি।

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ