Foto

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী


জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কের পথে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো সেখানে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন। শুক্রবার সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে একদিন যাত্রাবিরতি করে রোববার তিনি নিউ ইয়র্কে পৌঁছাবেন। দশ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে যোগ দেবেন।


অধিবেশনের ফাঁকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ছাড়াও একাধিক বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার। জাতিসংঘে আসা বিশ্ব নেতাদের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দেবেন।

জাতিসংঘে এবারের সফরে ৫০ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্যবসায়ীদের ২০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলও তার সফরসঙ্গী হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, সংসদের প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ এবং বেসামরিক-সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সেখানে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে সাধারণ বিতর্ক। এই বিশ্ব সংস্থার ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা তাতে অংশ নেবেন।

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে মেকিং দি ইউএন রিলেভেন্ট টু অল পিপল: গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যান্ড শেয়ারড রেসপনসিবিলিটিস ফর পিসফুল, ইকুইটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল সোসাইটিস।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষে তার বক্তব্য তুলে ধরবেন। গতবারের মত এবারও তার ভাষণে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ গুরুত্ব পাবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এবারের অধিবেশনে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পাবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট, বিশ্ব শান্তি ও শান্তিরক্ষা কর্মসূচি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয়গুলোর প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে গুরুত্ব পাবে।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে গত বছরের ২৫ অগাস্ট থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার ভার বাংলাদেশ বহন করে চলেছে কয়েক দশক ধরে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গতবছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করলেও এখনও প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে গতবছর সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সঙ্কট সামাল দিতে দূরদর্শী ভূমিকার জন্য এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন চলাকালে নিউ ইয়র্কে দুটি পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মানবিক কারণে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে নজির স্থাপন করায় প্রেস সার্ভিস নিউজ এজেন্সি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইন্টারন্যাশনাল এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেবে।

এর আগে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান ও বুট্রোস বুট্রোস-ঘালি এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট মার্তি আহতিসারি এ পুরস্কার পেয়েছেন।

এছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে দাতব্য সংগঠন গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন-এর পরিচালনা পর্ষদ শেখ হাসিনাকে স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড দেবে।

ব্যস্ত সূচি

 

জাতিসংঘ অধিবেশন উপলক্ষে দশ দিনের এই সফরে ব্যস্ত সময় কাটবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। 

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী লন্ডন পৌছালে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নাজমুল কাওনাইন হিথরো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন।

শনিবার লন্ডনে কাটিয়ে রোববার সকালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে নিউ ইয়র্কের পথে রওনা হবেন শেখ হাসিনা। সেদিন দুপুরে নিউ জার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাবেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মাদ জিয়াউদ্দিন এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন।

নিউ ইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে। রোববার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্ক হিলটন মিডটাউনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেওয়া এক সংবর্ধনায় যোগ দেবেন তিনি।

সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী মিশনের আয়োজনে গ্লোবাল কল টু অ্যাকশন অন ড্রাগ প্রবলেম শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকে যোগ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

পরে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের আয়োজনে গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন রিফিউজিস: এ মডেল ফর গ্রেটার সলিডারিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি অংশ নেবেন।

সেদিন দুপুরে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করে হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতে যুক্তরাষ্ট্র চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজ অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সোমবার বিকালে জাতিসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে নেলসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে বক্তৃতা দেওয়ার পাশাপাশি কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর আয়োজনে নারী শিক্ষায় বিনিয়োগ-সংক্রান্ত একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেবেন।

জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূতের আয়োজনে সেদিন সন্ধ্যায় মেইকিং ইমপসিবল পসিবল: আনলকিং হিউম্যান পটেনশিয়াল থ্রু দি ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স ফ্যাসিলিটি ফর এডুকেশন শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে রাতে লোটে নিউ ইয়র্ক প্যালেস হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সংবর্ধনায় যোগ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

২৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে তিনি সাইবার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক এক সভায় যোগ দেবেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিএ) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করছে।

সেদিন দুপুরে জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া ভোজসভায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত অ্যাকশন ফর পিস কিপিং (এ ফোর পি) শীর্ষক বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি।

২৬ সেপ্টেম্বর, ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর, ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিজিস (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্দি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি মঘেরনিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দ্বিপক্ষীয় সম্মেলন কক্ষে পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী সেদিন নেদারল্যান্ডসের রাণী ম্যাক্সিমার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান ক্লাউস সোয়াবের সঙ্গে তার বৈঠকের সূচি রয়েছে।

সফরের চতুর্থ দিন ২৬ সেপ্টেম্বর এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রেস্টি কালিজুলেইদের সঙ্গে বৈঠক হবে শেখ হাসিনার।

একই দিনে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি ফেদেরিকা মঘেরিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের স্থায়ী মিশন এবং ওআইসি সচিবালয়ের যৌথ আয়োজনে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে যোগ দেবেন।

সেদিন দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ বিশ্ব সংস্থার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক হবে শেখ হাসিনা। পরে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের (আইসিআরসি) প্রেসিডেন্ট পিটার মওরার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে তার বৈঠকের সূচি রয়েছে।

লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্টের আয়োজনে বিকালে নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শীর্ষক এক আলোচনায় অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইন্টার প্রেস সার্ভিসেস (আইপিএস) আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেবেন তিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সদর পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। বরাবরের মত এবারও বাংলা ভাষায় তিনি বাংলাদেশের অবস্থান এই বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন।

রাতে নিউ ইয়র্কের পার্ক এভিনিউয়ে গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন আয়োজিত বার্ষিক নৈশভোজে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা।

প্রতিবারের মত এবারও সাধারণ পরিষদে ভাষণের পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংবাদ সম্মেলনে আসবেন প্রধানমন্ত্রী।

পরদিন শনিবার নিউ ইয়র্ক থেকে রওনা হয়ে লন্ডনে দুদিন কাটিয়ে ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীরদেশে ফেরার কথা রয়েছে।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ