Foto

চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ কোটি টাকাই পানিতে


সাগরে ভাসমান কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার খেসারত হিসেবে ৪ কোটি টাকাই পানিতে গেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। আমদানি পণ্যের খরচ কমাতে সাগরে এ টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব পায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক কোম্পানি পাবলিক ডোমেইন আর্কিটেক্টেন।


বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে ’বেঙ্গল ডাচ ইন্টারন্যাশনাল’। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কনসালট্যান্সিতে এ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার কথা ৯ লাখ ৭২ হাজার ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় আট কোটি টাকা। সম্ভাব্যতা যাচাই করে ছয় মাসের মধ্যে কারিগরি ও আর্থিক সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেবে বলে ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাদের সঙ্গে চুক্তিও করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ১৩ মাস পরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় সমাধান করতে পারেনি তারা। এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি তারা ভাসমান এ টার্মিনালের নকশাও। প্রতিকূল আবহাওয়ায় এ প্রকল্প কীভাবে কাজ করবে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সময় ও ব্যয় কত- বন্দর কর্তৃপক্ষের পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ এমন ১০টি প্রশ্নেরও কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি কনসালট্যান্সি ফার্ম। অথচ এরই মধ্যে তারা তুলে নিয়ে গেছে প্রকল্পের অর্ধেক টাকা। চাপ দিচ্ছে বাকি টাকা আদায়ে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, "বহির্নোঙর বা সাগরে জাহাজ থেকে খোলা পণ্য নামানোর সুযোগ থাকলেও কনটেইনার নামানোর সুযোগ নেই। কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয় শুধু বন্দরের জেটি ও টার্মিনালে। এ জন্য কিছু জাহাজকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এতে পণ্য ব্যয় বাড়ে ব্যবসায়ীদের। এ জন্য সাগরে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব পায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান ’পাবলিক ডোমেইন আর্কিটেক্টেন’। কিন্তু তাদের পারফরম্যান্স হতাশাজনক।" বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা প্রসঙ্গে বন্দরের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম. আরিফুর রহমান ইতিপূর্বে সমকালকে বলেন, ’যে প্রতিষ্ঠান ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি তদারকি করছে, তাদের পরিকল্পনায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ প্রকল্প দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কীভাবে কাজ করবে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় কত, কত দিনে কীভাবে এই টাকা ফেরত আসবে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৮ কিলোমিটার ড্রেজিং কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হবে- এমন ১০টি প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাইনি আমরা।’

জানা গেছে, ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প ’টেকনো ইকোনমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি অব অ্যা ফ্লোটিং হারবার অ্যাট দ্য আউটার এরিয়া ইন চিটাগং পোর্ট’-এ কাজ পেতে আগ্রহ দেখিয়েছিল দেশি-বিদেশি ২৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর ’পাবলিক ডোমেইন আর্কিটেক্টেন’কে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে তারা কারিগরি ও আর্থিক সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেবে বলে একটি সমঝোতা চুক্তিতে সই করে ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কনসালট্যান্সি বাবদ তাদের দেওয়ার কথা ৯ লাখ ৭২ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় আট কোটি টাকা। মূল প্রকল্প অনেক দূর থাকলেও শুধু খসড়া দেখিয়ে এ প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বন্দর থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের পাঠানো প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে বাকি টাকা নিতেও দেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে চাপ দিচ্ছে তারা।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে আনা হয়। এর পর এ জেটি থেকে আরেকটি জাহাজে তুলে তা পানগাঁও নেওয়া হয়। এতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ছে। আবার সময়ও বেশি লাগছে। ব্যবসায়ীদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। বহির্নোঙরে আসা বড় জাহাজ থেকে কনটেইনার নামিয়ে ছোট জাহাজে তুলে সরাসরি পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) নিতেই ভাসমান এমন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তারা। এর মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সমুদ্র বাণিজ্যের চাপও সামাল দিতে চেয়েছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান ও চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ’ক্রমবর্ধমান সমুদ্র বাণিজ্য সামাল দিতে বন্দরে নতুন জেটি দরকার। কিন্তু রাতারাতি এই জেটি নির্মাণ সম্ভব নয়। ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে এ সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করতে পারত বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে স্পর্শকাতর এ কাজ করতে গিয়ে তার বড় খেসারত দিতে হবে বন্দরকে।’ একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান একেএম সামশুজ্জামান রাসেল বলেন, ’যে স্থানে এই টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, সেখান থেকে বন্দর চ্যানেল খুব কাছেই। তাই খুব সাবধানতার সঙ্গে এ কাজ করতে হবে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। ভাসমান এ টার্মিনালে যদি কনটেইনার পণ্যের পাশাপাশি খোলা পণ্য নামানোর ব্যবস্থা রাখা যায়, তবে পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক কমবে। এখন চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের ৭৪ শতাংশ খালাস করতে হয় বহির্নোঙরে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামা করা বেসরকারি ১৬টি ঘাটও আধুনিকায়ন করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ