Foto

ঘুরে দাঁড়ানোর ৪৮ বছর


১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ ডলার। এ পরিমাণ আয় নিয়ে বিশ্বের একেবারেই গরিব দেশের তালিকায় জায়গা হয় বাংলাদেশের। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, ফাঁকা রাজকোষসহ নানা সংকটে নিমজ্জিত বাংলাদেশ তখন সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দেশ।


যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ হলিস বি. চেনারিকে তখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানসম্পন্ন মাথাপিছু আয়ের তালিকায় যেতে বাংলাদেশের কতদিন লাগবে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ১৯৬৫ সালকে ভিত্তি ধরে মাথাপিছু আয় ৮০০ ডলারে বা ১৯৭৩ সালকে ভিত্তি ধরে ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে বাংলাদেশের ১২৫ বছর লাগবে। এই হিসাব বাংলাদেশ ভুল প্রমাণ করেছে অনেক আগেই। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন প্রায় দুই হাজার ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ধরা হয়েছে। আর মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯০৯ ডলার।

আজ ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর আগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতার সময়ে বাংলাদেশের যে ভঙ্গুর অবস্থা ছিল, তাতে এত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ উন্নয়নের এই স্তরে পৌঁছাবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ’ভারত :উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে, এ কথা তখন কেউ ভাবেনি। দেশ স্বাধীনের পর অনেকেই তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেউ কেউ তাকে ’বাস্কেট কেস’ বলে খরচের খাতায় ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, এই দেশকে কোনো অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়াই উচিত নয়। কারণ দেশটি জনসংখ্যা বিস্ম্ফোরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করে উঠতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ অনেকের সেই ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি আয় ছিল ২৯৮ কোটি টাকা। আমদানি ব্যয় ছিল ৭৩২ কোটি টাকা। এরপর যত দিন গেছে, শিল্পায়নের ফলে আমদানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রফতানি আয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। রফতানি করেছে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। পাশাপাশি আরও ৬ বিলিয়ন ডলারের সেবা রফতানি করেছে। রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে বহুগুণ। রেমিট্যান্স আসছে বছরে ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর। পাকিস্তানের ছিল ৫৩ বছর। ভারতের ছিল ৪৮ বছর। বাংলাদেশ তাদের পেছনে ফেলেছে। বাংলাদেশের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। ভারত ও পাকিস্তানের গড় আয়ু যথাক্রমে ৬৯ ও ৬৬ বছর। পাঁচ বছরের কম শিশু মৃত্যুহারেও একসময় বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। ২০১৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণের পর প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যু ঘটে। পাকিস্তানে এ সংখ্যা ৭৯। নবজাতক মৃত্যুর হারও বাংলাদেশ তাদের চেয়ে বেশি হারে কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ২৮ জন। পাকিস্তানে এ সংখ্যা ৬৪ আর ভারতে ৩৫ শিশু। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার একসময় অনেক বেশি ছিল। এ ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। এখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ৯৮ ভাগ শিক্ষার্থী। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ হার ৭২ শতাংশ। বাংলাদেশ ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের মতো এত দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারেনি কোনো দেশ। ২০১৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। পাকিস্তানে এ হার ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

মতামত জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত। সেই অবস্থায় আজকের বাংলাদেশকে চিন্তা করা অসম্ভব ছিল। এটা সম্ভব হয়েছে কৃষিতে বিপ্লব ও শিল্পে রূপান্তরের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক ও নির্মাণের মতো কিছু খাত ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি সফল হয়েছে। স্থানীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আয়ুস্কাল বেড়েছে এবং শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার কমেছে। বেড়েছে স্কুলে যাওয়ার হারও। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন ও শ্রমশক্তিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। সামাজিক অনেক সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান কমে এসেছে; যা স্বাধীনতার সময় অভাবনীয় ছিল, তা এখন বাস্তবতা।

জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি আকাঙ্ক্ষাও বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ানো, পুষ্টিহীনতা দূর ও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ছাড়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ভঙ্গুর অবকাঠামো, খাদ্য সংকট, শূন্য রাজকোষ আর বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়াই পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে থাকে সরকার। তবুও ভেঙে পড়েননি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখান। পাকিস্তানি সেনারা যুদ্ধের সময় পুড়িয়ে দেয় টাকা-পয়সা। ধ্বংস করে শিল্পকারখানা।

সেই বাংলাদেশে এখন ৫৭টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। রয়েছে শতাধিক বীমা কোম্পানি। শিল্প উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার। পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকার কারণেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণের সাহস পেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারে, যা এখন বিশ্বের ৩০তম। স্বাধীনতার সময় আলো বলতে কেরোসিন পুড়িয়ে টিমটিমে জ্বলা কুপির আলোই বুঝত মানুষ। এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত দেশের ৯০ শতাংশ এলাকা। বিশ্বের অনেক দেশ ও বড় বড় কোম্পানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করছে। অনেকে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে। ইস্পাত শিল্প, গাড়ি সংযোজন শিল্পের মতো ভারী শিল্প হচ্ছে দেশে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপান, চীন, ভারত, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ান বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ পরপর চারটি শস্য উৎপাদনে মার খায়। ১৯৭১-৭২ সালে আমন উৎপাদন ১৯৬৯-৭০-এর তুলনায় ১৯ শতাংশ কম হয়। প্রয়োজনীয় বীজ, সার, উপকরণের অভাবে বাহাত্তরে বোরো উৎপাদন আগের বছরের চেয়েও ২০ ভাগ কমে যায়। ১৯৭২-৭৩-এ স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহতম খরায় আউশ ও আমন উৎপাদন মার খায়। ১৯৬৯-৭০ সালে যেখানে ২৯ দশমিক ৬৩ লাখ টন আউশ হয়েছিল, ’৭২-৭৩-এ তা নামে ২২ দশমিক ৭৩ লাখ টনে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে লবণ, তেলসহ অন্য নিত্যপণ্যের দামও। বিশ্ববাজারেও ওই সময় খাদ্যপণ্য সংকট দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যসহ তেলের দর বেড়ে যায়। সরকার বাধ্য হয় অন্য দেশের কাছে হাত পাততে। সেই বাংলাদেশে এখন উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। কেবল খাদ্যশস্য উৎপাদনই নয়, মাছ উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয় শীর্ষস্থানে রয়েছে। গম ও ভুট্টার বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন অভিযাত্রায় কয়েকটি বড় স্বীকৃতি মিলেছে গত কয়েক বছরে। গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংক এ দেশকে ’নিম্ন’ থেকে ’নিম্ন মধ্যম’ আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের অ্যাওয়ার্ড পায় বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশে এসে ঘোষণা দেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী দক্ষতা সারাবিশ্বের জন্য শিক্ষণীয়।

পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক পর্যায়ে স্বাধীনতার ডাক দেয় মুক্তিকামী বাঙালি। সেই পাকিস্তানের পরিচিতি এখন দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় ও পিছিয়ে পড়া এক রাষ্ট্র হিসেবে। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ষাটের দশকে এ ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। এ অঞ্চলের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সেই অবস্থার পরিবর্তন করেছে অনেক আগেই। এক দশক ধরে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি থাকার পর গত তিনটি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে তা ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অথচ পাকিস্তান এখনও ৬ শতাংশের নিচে আছে।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ