Foto

গণতন্ত্র ‘পুনরুদ্ধারে’ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন


সিলেটের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভা থেকে গণতন্ত্র ‘পুনরুদ্ধারে’ আন্দোলনের জন্য সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কামাল হোসেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে জোট গঠনের পর বুধবার প্রথম জনসভায় এই আহ্বান জানান তিনি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিও জানান কামাল।


জনসভার প্রধান অতিথি কামাল বলেন, “স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে হলে, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে হলে, ক্ষমতার মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সকলকে মাঠে নামতে হবে।

“আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, ঐক্যফ্রন্ট ঐক্যবদ্ধ হোন, বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। বাংলাদেশের জনগণের জয় হবেই। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আবার দেশে মালিক হব, এই রাষ্ট্র আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনব।”

সিলেট নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠের এই জনসভার প্রধান বক্তা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে তাদের জোটের ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা, আমাদের লক্ষ্য মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা, আমাদের লক্ষ্য একটি কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র নির্মাণ করা। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।

“আজকে সরকারের শত বাধা-প্রতিবন্ধকতার পরও সারা সিলেট থেকে মানুষ ছুটে এসেছে এই জনসভায়। তারা প্রমাণ করেছে তারা গণতন্ত্র ফিরে পেতে চায়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের অধিকারকে ফিরিয়ে আনব।”

বুধবার বেলা ২টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এই সভায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্য দুই শরিক দল জেএসডির আ স ম আবদুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাও বক্তব্য রাখেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করেপারেশনের মেয়র বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী।

হজরত শাহজালাল ও শাহ পরানের মাজার জিয়ারত করে জনসভায় যান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

জনসভার মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, মাদার অব ডেমোক্রেসী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি।

মঞ্চের পশ্চিম দিকে রেজিস্ট্রারি ভবনের টানানো ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রায় বাতিলের দাবি সম্বলিত বেশি কিছু ডিজিটাল ব্যানার। জিয়াউর রহমান, সদ্য গ্রেপ্তার মইনুল হোসেন, নিখোঁজ সাবেক সাংসদ এম ইলিয়াস আলীর ছবি সম্বলিত ব্যানারও ছিল জনসভাস্থলে। জনসভায় আসা অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে যুক্ত থাকা কামাল বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী এদেশের মালিক জনগণ। জনগণকে এই মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। যদি মালিকানা যদি পুনরুদ্ধার করতে হয় তাহলে জনগণের ঐক্য অপরিহার্য।

“এজন্য ঐক্য লাগবে। দলীয় ঐক্য নয়, জাতীয় ঐক্য। তাই আজকে সবাইকে সংগঠিত হতে হবে। সকলকে এক হয়ে বলতে হবে, আমরা দেশের মালিক। আমাদেরকে মালিকানা ফিরে পেতে হলে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। সেজন্য আমাদের এক নম্বর দাবি হল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।”

এই দাবিতে গ্রামে-গ্রামে, জেলায়-জেলায় সবাইকে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কামাল বলেন, “এটিকে হালকাভাবে নেবেন না। এই যাত্রায় জনগণ সাড়া দিয়েছে। অবশ্যই জনগণের মালিকানা এবার ফিরে পাবে।”


বিএনপি মহাসচিব ফখরুল বলেন, “এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ভোটের অধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং সাজাপ্রাপ্ত সকল বন্দিকে মুক্ত করতে হবে।

“এই সরকারকে বলতে চাই, তফসিল ঘোষণার পূর্বে পদত্যাগ করুন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন, সংসদ বাতিল করুন।”

এসব দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকার নমনীয় না হওয়ায় আন্দোলন করে দাবি আদায়ের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন বিএনপি নেতারা।

আন্দোলনের জন্য ত্যাগ স্বীকারে সবাই প্রস্তুত কি না- ফখরুল প্রশ্ন করলে জনসভায় আগত নেতা-কর্মী-সমর্থকরা হাত তুলে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

জেএসডির সভাপতি রব বলেন, “দেশটা ডাকাতের হাতে পড়েছে। আপনারা কি মুক্তি চান? খালেদা জিয়ার মুক্তি চান? গণতন্ত্র ফিরে পেতে চান? সকলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুধু নিজেরা মাঠে নামলে হবে না, জনগণকে নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

“সরকার উস্কানি দেবে, উস্কানিতে পড়বেন না। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে হবে। এই লড়াই বাঁচার লড়াই, এই লড়াই ভোটের লড়াই, এই লড়াই গণতন্ত্রের লড়াই, এই লড়াইতে আমাদের অবশ্যই জিততে হবে।”

বিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার-হয়রানি নিয়ে সরকারকে হুঁশিয়ার করে রব বলেন, “আর যদি এভাবে আমাদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়, সারাদেশের মানুষ রাস্তায় নামবে।”

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মান্না বলেন, “আজ আমাদের শপথ নেওয়ার সময়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আড়াই মাস পরে যদি ভোট হয়, এই ভোটে আমরা জিততে পারব? গতবার ভোট হয়েছিলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। তখন তো মাঠে বিপক্ষ নাই, একদল খেলেছে- ওয়াকওভার।

“যদি কেউ মনে করে এবার ওয়াকওভার নিয়ে আবার ক্ষমতায় থাকবে। প্রথমেই বলতে চাই কোনো ওয়াকওভার দেওয়া হবে না। গতবার নির্বাচনের সময়ে ঘরের ভেতরে ছিলেন। এবার যদি নির্বাচন হয়, আমরা যদি নির্বাচনে অংশ নিই, ঘর থেকে বেরিয়ে কোটি কোটি জনগণ মাঠে থাকবেন, কেন্দ্রে থাকবেন। এবার জয়যুক্ত হবেন।”

সরকারকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তফসিল ঘোষণার আগে অনতিবিলম্বে আমাদের সাথে কথা বলেন। আমাদের দাবি মানেন। যদি না মানেন, তাহলে কিভাবে ক্ষমতায় থেকে নামাতে হয়, সেই পথেই আমরা হাঁটব।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লাখো লাখো মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। দেশনেত্রীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে। কেন? আমাদেরকে বাদ দিয়ে তারা আগের মতো নির্বাচনের খেলা খেলতে চায়।

“সরকারকে বলছি, কেন আপনারা জনগণকে ভয় পান। ভয় পান এই জন্য যে, সিলেটের কৃতি সন্তান ইলিয়াস আলীসহ শত শত নেতা-কর্মীদের গুম করেছেন, তার জবাব দিতে হবে। এই সরকার ভয় পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ লুট করেছে, স্বর্ণ লুট করেছে, কয়লা লুট করেছে, শেয়ারবাজার লুট করেছে, তার জবাব দিতে হবে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, “দেশে একটা স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আছে, জোর করে তারা ক্ষমতায় আছে, জোর করে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়। এদেরকে অপসারণ করতে হলে ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই।

“এই ঐক্যের মাধ্যমেই সরকারকে সংলাপে আসতে বাধ্য করা হবে। সমঝোতায় আসতে হবে। যদি সমঝোতায় না আসেন, ধরে নেব আপনারা দেশে গণতন্ত্র চান না, আপনারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে চান না। সেক্ষেত্রে দেশের মানুষ সময়মতো উপযুক্ত কর্মসূচি নিয়ে তার জবাব দেবে।”

জনসভায় বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুর রহমান, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, ফজলুল হক আসপিয়া, এনামুল হক চৌধুরী, এম এ হক, তাহসিনা রুশদির লুনা, খায়রুল কবির খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, আ ও ম শফিকউল্লাহ, এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, জেএসডির তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, ইস্কান্দার হায়দার চৌধুরী, বেলায়েত হোসেন, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, জিল্লুর রশীদ চৌধুরী, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমেদ, আ ব ম মোস্তফা আমিন বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্য রাখেন গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ২০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের এম এ রকীব, খেলাফত মজলিশের আহমেদ আবদুল কাদের, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির এম এম আমিনুর রহমান, সাবেক সাংসদ শাম্মী আখতার, কলিমউদ্দিন আহমেদ মিলন, দিলদার হোসেন সেলিম, জি কে গউছ, সিলেটের বিএনপি নেতা আবদুল কাহের চৌধুরী শামীম, আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকি, আলী আহমেদ, আজমল বখত সাদেক।

জনসভায় বিকল্পধারার একাংশের মহাসচিব শাহ আহমেদ বাদল, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান, এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব সাহাদাত হোসেন সেলিম, বিএনপির ফরহাদ হালিম ডোনার, বিলকিস জাহান শিরিন, সানাউল্লাহ মিয়া, শিরিন সুলতানা, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নাজিম উদ্দিন আলম, শামীমুর রহমান শামীম, এমএম শাহিন, সুজাত আলী, ইশতিয়াক হোসেন, জাসাসের হেলাল খান, শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।

জনসভার পরপরই গ্রেপ্তার

জনসভা শেষ হওয়ার পরপরই বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে রেজিস্ট্রারি মাঠে জনসভা শেষে নেতাদের সঙ্গে শহরের রোজ ভ্যালী হোটেলে গিয়েছিলেন মুক্তাদির। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ তাকে আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।

ওসমানী বিমানন্দরে অপেক্ষারত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের কাছে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে মুক্তাদিরকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি বলেন, “গত দুই দিন যাবত এই জনসভাকে কেন্দ্র করে সিলেটে আমাদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হয়েছে। শত বাধার পরও শান্তিপূর্ণ জনসভা শেষে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করে সরকার দমনপীড়ন করে জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীল নকশা করছে।”

 

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ