Foto

খালেদা জিয়ার প্রার্থী হওয়ার পথ রুদ্ধ?


বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে তিনটি মনোনয়নপত্র কেনা হয়েছে। যদিও তিনি প্রার্থী হিসেবে যোগ্য হবেন কি না, তা এক বড় প্রশ্ন হিসেবে ঝুলে আছে। দুটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া দণ্ডিত হওয়ায় নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে খোদ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যেই কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন।


নির্বাচনী তফসিলে পরিবর্তন এসেছে, নতুন তফসিল অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ। এই সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার পক্ষে সাজা স্থগিত চেয়ে নিয়মিত আপিল করার সুযোগ নেই। তবে আপিল বিভাগের ১৯৯৬ সালের রায়ের আলোকে বলা যায়, দুটি মামলায় তাঁর দণ্ড সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে যোগ্য ঘোষণা করার এখতিয়ার রাখে।

আপিল বিভাগের এই রায়টি নিয়ে অবশ্য খুব আলোচনা হয়নি। দুই বছরের বেশি কারও দণ্ড এবং আপিলে তার কার্যকারিতা স্থগিত না হওয়া মানেই নির্বাচনে অযোগ্য—সাধারণভাবে এর প্রচারটিই বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি নজিরবিহীন অবস্থা বলা যায়। কারণ, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য মনোনয়নপত্র কেনা হয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলই করতে পারবেন না। কারণ, আপিলের জন্য দুটি রায়েরই পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া দরকার। কিন্তু এত অল্প সময়ে তা পাওয়াই সম্ভব হবে না। এখন এটাও দেখার বিষয়, এ ধরনের একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে উদ্ভাবনীমূলক কোনো প্রতিকার বিএনপি আশা করে কি না। বা সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের আওতায় তারা বিশেষ প্রতিকার চায় কি না। এ অনুচ্ছেদ আপিল বিভাগকে কমপ্লিট জাস্টিসের স্বার্থে যেকোনো ধরনের আদেশ বা নির্দেশনা দেওয়ার অগাধ এখতিয়ার দিয়েছে।

এখন মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ তারিখের মধ্যে রায় না পাওয়ার সুবিধা রিটার্নিং কর্মকর্তার বা ইসি নিতে পারে। কারণ, সংবিধানের ৬৬ (২) অনুচ্ছেদমতে, ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হলেই চলবে না, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণ নৈতিক স্খলনজনিত হতে হবে। সার্টিফায়েড কপি না পাওয়া পর্যন্ত ইসি আইনগতভাবে অনুমান করতে পারে না যে বিএনপির চেয়ারপারসন নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন কি না। এখানে নৈতিক স্খলন ব্যাপক অর্থে নয়, কিছু সুনির্দিষ্ট মাপকাঠিতে বিবেচনা করতে হবে। ২০০১ সালে আপিল বিভাগ এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে কার্যত তিনটি মাপকাঠি ঠিক করে দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে যে প্রথমত, তিনি দণ্ডিত হওয়ায় সাধারণভাবে বিবেক বা সমাজ আঘাত পেয়েছে কি না? দ্বিতীয়ত, আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই তিনি কুয়েতের নেতার অনুদানটি গ্রহণ করেছিলেন কি না? তৃতীয়ত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সমাজের চোখে নীতিবিবর্জিত (ম্যান অব ডিপ্রেব ক্যারেক্টার) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন কি না কিংবা সমাজ তাঁকে খাটো করে দেখে (লুকড ডাউন) কি না। এসবের উত্তর হ্যাঁ হলেই শুধু মনোনয়নপত্র বাতিল করা যাবে। কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন হলো, তিন আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা কীভাবে তা যাচাই করবেন, কারণ তাঁর হাতে রায় থাকবে না। এই অপারগতার সুবিধা খালেদা জিয়া পাবেন।

গণভবনের সংলাপে সরকার বলেছে, খালেদা জিয়ার প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত বলেই রেখেছেন, এটি ইসির ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ইসির নেওয়া সিদ্ধান্তের বৈধতা রিটে পরীক্ষা না করতেও আপিল বিভাগের নির্দেশনা আছে। আপিল বিভাগ আরও বলেছেন, বৈধতা পরখ করতে চাইলে ভোটের পরে করতে হবে, ভোটের আগে নয়। তফসিলের পরে একে নির্বাচনী বিরোধ হিসেবে দেখতে হবে। আর সেটা মেটাবে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। হাইকোর্টের বিচারকদের নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল অনধিক ছয় মাসের মধ্যে রায় দেবেন।

আমরা স্মরণ করতে পারি, ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার বহু পরে সংসদের শেষ বছরে ২০০০ সালে এরশাদ সাংসদ পদ হারান। দণ্ডিত অবস্থায় ২০০৮ সালে মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংসদ হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন, এরপর তিনি সাংসদ পদ হারান। আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনে যেতে পারবেন কি পারবেন না, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের দুটি রায় আছে। রায় অনুযায়ী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন। একটি বলেছে পারবেন, অন্যটি বলছে পারবেন না। আসলে রায় আছে অনেকগুলো। কিন্তু বিচারপতি মোস্তাফা কামাল এক রায়ে বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে দুটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া আর কিছুতেই হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। এই দুটি ক্ষেত্র হলো, যে আইনে নির্বাচন হচ্ছে, সেই আইনটি নিজেই বিদ্বেষপূর্ণ, আর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর (রিটার্নিং কর্মকর্তা বা ইসির) সিদ্ধান্ত নেওয়ারই কোনো আইনগত এখতিয়ার না থাকা। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া কারাগার থেকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবেন। তা মঞ্জুর হলে সংক্ষুব্ধরা বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করবেন। আপিল বিভাগ বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পরে এ ধরনের অযোগ্যতার প্রশ্ন ঠিক হবে ভোটের পরে, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়ন বাতিল করলেও রিট চলবে না। লেখকের জানামতে, এই রায় পাল্টে যায়নি। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে এটাই ঘোষিত আইন (ল ডিক্লার্ড), যা হাইকোর্টসহ অধস্তন সব আদালতের জন্য কার্যকর। এমনকি তা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের জন্যও প্রযোজ্য।

আসলে দরকার ছিল অযোগ্যতা-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের সব অস্পষ্টতা দূর করা। হাইকোর্টের একাধিক সাংঘর্ষিক রায় আছে। কিন্তু যখন যেমন তখন তেমন ফল পাওয়ার জন্য আইনপ্রণেতারা এখানে ফাঁকফোকর রাখতে ভালোবাসেন। এই ফাঁক বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে মেরামত করতে পারত। তারা করেনি। সেই অর্থে বলব, খালেদা জিয়া নিজের তৈরি ফাঁদে নিজে পড়ছেন।

দণ্ডিত ব্যক্তির নির্বাচনে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়ে আনুষঙ্গিক প্রশ্ন নিয়ে আইনি মতভিন্নতার কোনো ঘাটতি নেই। খালেদা জিয়ার এক আইনজীবী মনে করেন, হাইকোর্টের সাজা বাড়ানোর পূর্ণাঙ্গ রায়টি হাতে পাওয়া ছাড়াই তাঁরা সেটির কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে এখনই যেতে পারেন। কিন্তু যাবেন কি না, তা দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। খালেদা জিয়ারই আরেকজন প্রবীণ আইনজীবী দ্বিমত করেন। তাঁর মতে, পূর্ণাঙ্গ রায় ছাড়া আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য সবাই একমত, পূর্ণাঙ্গ রায় না পেলে জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় বিশেষ জজ আদালতের দেওয়া সাত বছরের সাজার বিরুদ্ধে তাঁরা আপিল করতে পারবেন না।

ওই দুটি মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি নিশ্চিত করেন যে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া যাবে না। আর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা মঞ্জুর করার কোনো রেওয়াজ বা অতীত নজির নেই। খালেদা জিয়ার আইনজীবী কায়সার কামালের মত হলো, পূর্ণাঙ্গ রায়ের নকল ছাড়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গেলে স্থগিতাদেশ দেওয়ার রেওয়াজ না থাকতে পারে, কিন্তু তা বাধা নয়। কারণ, আদালতের হাত অনেক লম্বা। তবে তাঁর আশঙ্কা, খালেদা জিয়া যাতে অযোগ্য হন, সেই চেষ্টায় কোনো ত্রুটি সরকার রাখবে না। সার্বিকভাবে মনে হলো, পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে যথেষ্ট বিলম্ব যে হতে পারে, সে জন্য বিএনপির মানসিক প্রস্তুতি আছে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে ১১ নভেম্বর রাতে আমরা কথা বলি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে রিট চলে না মর্মে আপিল বিভাগের রায় যে এখনো বলবৎ রয়েছে, সেটা তিনি নিশ্চিত করেন। নৈতিক স্খলন বিষয়ে আগে যে তিনটি মাপকাঠির কথা বলেছি, সেই রায়টিও বদলে যায়নি বলে তিনি জানালেন।

তবে তাঁর কথায়, দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের বেশি দণ্ড থাকার কারণে তাঁর মনোনয়নপত্র দাখিলে এই মুহূর্তে সাংবিধানিক বাধা আছে। কিন্তু এর প্রতিকারের জন্য রায় দুটি দরকার। এখনো তা পাইনি, তাই আপিল করতে পারছি না। তিনি স্মরণ করেন যে বর্তমান সরকারের আমলেই দণ্ডিত এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তির রায় স্থগিত হয়নি, অথচ তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করার উদাহরণও আছে। রোববার রাতে যখন তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন পেছালে এবং আপিল করার সুযোগ পেলে তাঁরা এসব বিষয় আদালতের নজরে আনবেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রার্থী হওয়ার আইনি লড়াইটা শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়, তা–ই এখন দেখার বিষয়।

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ