Foto

কয়েকটি প্রযুক্তিসেবাকে ২০১৮ সালে বিদায়


সবকিছু চিরদিন ভালো লাগে না। আজ যা ভালো লাগে, কাল তা বিরক্তিতে পরিণত হতে পারে। মানুষের পছন্দের পরিবর্তন হতে থাকে। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত পণ্য ও সেবার ব্যবহারের ওপরেও তার প্রভাব পড়ে। ভালো লাগার চক্রটি প্রযুক্তিক্ষেত্রেও লক্ষ করার মতো। সম্ভাবনাময় বড় প্রযুক্তিপণ্য বা সেবা থেকে কিছুদিনের মধ্যেই তার আবেদন হারিয়ে যেতে পারে। তখন এসব প্রযুক্তিসেবার নির্মাতারা এগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। ব্যবহারকারীরা তখন বিকল্প কিছু বেছে নেন।


অনেক সেবা আবার এতটাই পুরোনো হয়ে যায়, যা কেবল অতীতের স্মৃতি জাগানো ছাড়া কোনো কাজে আসে না। এ রকম কয়েকটি প্রযুক্তিসেবাকে ২০১৮ সালে বিদায় জানাতে হচ্ছে। চলুন জেনে আসি, এ রকম কয়েকটি প্রযুক্তিপণ্য সম্পর্কে:
ইয়াহু মেসেঞ্জার
একসময় বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং সেবা আজকের অ্যাপভিত্তিক ম্যাসেজিংসেবা বা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠছিল না। তাই নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ২০ বছর ধরে জনপ্রিয় ’ইয়াহু মেসেঞ্জার’ গত ১৭ জুলাই থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে বন্ধ হয় ডেস্কটপ সংস্করণ। ১৯৯৮ সালে ইয়াহু মেসেঞ্জার চ্যাটসেবা চালু হয়। প্রযুক্তি বিশ্বে যোগাযোগের অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে গুগল টক, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সেবাগুলোর সঙ্গে কোনোভাবে পেরে উঠছিল না এটি। অবশেষে ইয়াহু মেসেঞ্জারকে বিদায় করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ইয়াহু মেসেঞ্জারের পুরোনো ভার্সনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, ২০১৬ সালে নতুন ইয়াহু মেসেঞ্জার ভার্সনটি চালু করা হয়, ২০১৭ সালে ইয়াহু ভেরিজোনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। তবে ইয়াহু মেসেঞ্জার বন্ধ হলেও জনপ্রিয় ইয়াহু মেইল ও ইয়াহু ফ্যান্টাসি বন্ধ হচ্ছে না।
গুগল প্লাস
সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম চালু করার ক্ষেত্রে গুগল সফলতার মুখ দেখেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে তাদের গুগল প্লাস সেবাটিও। শিগগিরই হয়তো এর বিদায়ঘণ্টা বাজবে। গুগল প্লাস গ্রাহকদের কাছে ধরে রাখতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে গুগলকে। এটি আগামী বছরের এপ্রিল মাসে বন্ধ হয়ে যাবে। গুগল প্লাস বন্ধ করার ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিল অ্যালফাবেট কর্তৃপক্ষ। গত আগস্ট মাসে গুগল ফ্রান্সের অফিশিয়াল গুগল প্লাস পেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, গুগল প্লাসকে জনপ্রিয় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল গুগল। জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুললে গুগল প্লাসে অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক করেছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। চালু হওয়ার সাত বছরের মাথায় গুগল প্লাসের বিদায়ঘণ্টা বাজার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গুগল ফ্রান্সের অফিশিয়াল গুগল প্লাস পেজ বন্ধ করার বিষয়টি থেকেই এ অনুমান করেন বিশ্লেষকেরা। ফেসবুকের সঙ্গে টক্কর দিতে বেশ কয়েকবার নতুন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট চালু করে গুগল। ২০১১ সালে চালু হয় গুগল প্লাস। কিন্তু গুগলের এ সাইটও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি। অ্যালফাবেট স্বীকার করে নিয়েছে তাদের গুগল প্লাসের ব্যর্থতার বিষয়টি। এটি কখনোই ব্যবহারকারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়নি এবং খুব বেশি ব্যবহার করাও হয়নি। ৯০ শতাংশ গুগল প্লাস ব্যবহারকারী এতে একবার ঢুকলে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি থাকেন না। গুগল প্লাসের এপিআই নিয়ে নিরাপত্তাত্রুটির বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় এটি বন্ধ করে দেওয়ার পথেই হাঁটছে তারা। গ্রাহক পণ্য হিসেবে গুগল প্লাস বন্ধ করে দেওয়া হলেও এটি এন্টারপ্রাইজ ব্যবহারকারীদের জন্য চালু থাকবে। কারণ, গুগল প্লাস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট হিসেবে বেশি জুতসই বলে মনে করছে অ্যালফাবেট কর্তৃপক্ষ।
গুগল অ্যালো
গুগল যতটা আশা করেছিল, তাদের ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপ অ্যালো ততটা জনপ্রিয় হয়নি। চ্যাট করার অ্যাপ্লিকেশন অ্যালো বন্ধ করে দিচ্ছে গুগল। ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চালু থাকবে অ্যাপটি। অ্যালো বন্ধ করে অ্যান্ড্রয়েড মেসেজেস অ্যাপকে গুরুত্ব দেবে গুগল কর্তৃপক্ষ। এ অ্যাপে নতুন ফিচার যুক্ত করার পাশাপাশি এসএমএসের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে কাজ করবে তারা। গুগল কর্তৃপক্ষ বলেছে, অ্যালো ব্যবহারকারীদের চ্যাটের ইতিহাস ডাউনলোড করতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইনস্ট্যান্ট মেসেজিংয়ের বিকল্প খুঁজতে বলা হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে অ্যালো অ্যাপে বিনিয়োগ বন্ধ করে অ্যান্ড্রয়েড মেসেজেসকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে গুগল। এরপর থেকে অ্যালোর স্মার্ট রিপ্লে, জিআইএফ, ডেস্কটপ সমর্থন অ্যান্ড্রয়েড মেসেজেসে যুক্ত হয়। গুগল জানিয়েছে, গিভেন মেসেজেস ফিচারটি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। তাই মেসেজেসকে গুরুত্ব দিতে অ্যালোতে সমর্থন বন্ধ করা হচ্ছে। ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত অ্যালো চালু থাকবে।
স্টাম্বলআপন
এ বছরের জুন মাসে স্টামলআপনের সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্যারেট ক্যাম্প ঘোষণা দেন, তাঁদের ইন্টারনেট ডিসকভারি প্ল্যাটফর্মটি বন্ধ করে দেবেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে এটি চালু ছিল। ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আগ্রহের ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট দেখাত স্টাম্বলআপন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তার কারণে স্টাম্বলআপন জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। ২০১১ সালের জানুয়ারির প্রথম দিন সোশ্যাল মিডিয়া ট্রাফিকের দিক থেকে এগিয়ে ছিল স্টাম্বলআপন। এদিন শতকরা ৪৩ ভাগ সোশ্যাল মিডিয়া ট্রাফিক ছিলে স্টাম্বলআপনের দখলে। অন্যদিকে, ফেসবুকের ট্রাফিকের হার ছিলে ৩৮ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১০ সাল থেকেই ফেসবুক আর স্টাম্বলআপন সেরা দুটি সোশ্যাল মিডিয়া সাইট হিসেবে পাশাপাশিই ছিল।
গুগল ইনবক্স
গুগল তাদের সহজ মেইল ব্যবস্থাপনা সেবা গুগল ইনবক্স বন্ধ করে দেবে। ইনবক্সের সব ফিচার জিমেইলে যুক্ত হবে। চার বছর আগে ইনবক্স অ্যাপটি এনেছিল গুগল। আধুনিক ই–মেইল সেবা প্রদান করাই ছিলে তাদের উদ্দেশ্য। ইনবক্স অ্যাপে ম্যাসেজ থ্রেডিং, প্রয়োজনীয় বা প্রায়োরিটি মেইল আলাদা করা, মেইলের উত্তর দেওয়া বা সোয়াইপ জেসচারের মাধ্যমে ট্র্যাশ করা, একাধিক ই–মেইল এক ইনবক্সে দেখানোর মতো ফিচারগুলো দেওয়া হয়েছিল। গুগল বলছে, ইনবক্সের সব সেবা জিমেইল থেকে পাওয়া যাবে। ফিচার ইনবক্স থেকে জিমেইলে যুক্ত করার কাজ চলছে। ২০১৯ সালের মার্চে অ্যাপটি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে গুগল।
গুগল ইউআরএল শর্টনার
বড় বড় ওয়েবসাইটের লিংক বা ইউআরএল ছোট করার জন্য আমরা অনেকেই ইউআরএল শর্টনার সেবা ব্যবহার করে থাকি। ইউআরএল শর্টনার যেমন উপকারী, তেমনি মজারও। এ ক্ষেত্রে গুগলের সেবাটি অন্যতম জনপ্রিয়। ২০০৯ সালের চালু হওয়া গুগলের এই সেবা (goo.gl) বন্ধ হতে যাচ্ছে। ১৩ এপ্রিল থেকে গুগলের ইউআরএল শর্টনার সেবা বন্ধ হবে। তবে এর পরিবর্তে উন্নত মানের ফায়ারবেইজ ডায়নামিক লিংকস (এফডিএল) ব্যবহার করতে পারবেন আগ্রহীরা। এই স্মার্ট ইউআরএল সেবার মাধ্যমে যেকোনো জায়গার আইওএস, অ্যান্ড্রয়েড কিংবা ওয়েব অ্যাপের ব্যবহারকারীদের লিংক পাঠানো যাবে।
পাথ
বন্ধ হয়ে গেছে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়েবসাইট পাথ। গত ১৮ অক্টোবর থেকে তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাথ ২০১০ সালে যাত্রা করেছিল। এই প্ল্যাটফর্মে সর্বোচ্চ ৫০ জন বন্ধু যুক্ত করা যেত। পরবর্তী সময়ে বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ করা হয়। ফেসবুকে হাজারো বন্ধুর ভিড়ে সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পাওয়া যায় না। সত্যিকারের বন্ধুরা যেন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, সেই লক্ষ্যে ডেভ মরিন পাথ তৈরি করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ’পাথ একটি ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক এবং শুধু আপনার প্রিয় মানুষেরাই এখানে থাকবে। তাই এতে ব্যক্তিগত সব মুহূর্ত শেয়ার করা যাবে।’ ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ক্যারিবীয় অঞ্চল, পুয়ের্তো রিকো, ডোমিনিকা প্রজাতন্ত্র ও মধ্য যুক্তরাষ্ট্রের স্প্যানিশ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ অ্যাপ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল।
ক্লাউট
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তার কারণে ক্লাউট নামের সোশ্যাল মিডিয়া টুলটি বন্ধ করে দিচ্ছে লিথিয়াম টেকনোলজিস কর্তৃপক্ষ। ১০ বছর ধরে এটি চালু ছিল। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ সেবা চালু হয়। ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের রেটিং দিতে পারত। এ বছরের ২৫ মে সেবাটি বন্ধ হয়ে গেছে।

Facebook Comments

" প্রযুক্তি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ