Foto

কী হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে


জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাস করে বিত্তবৈভবের মালিক অনেকে, বর্তমান ও সাবেক ১৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা ,বদলি করা হলো কমিশনারকেও


দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে তোলপাড় চলছে। একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানের। অবসরপ্রাপ্ত এক কাস্টমস কর্মকর্তার গোপন ’ইউজার আইডি’ ব্যবহার করে সাত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ৯০০ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় চার হাজার চালান বন্দর থেকে খালাস করে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে লক করে রাখা সন্দেহভাজন চালানও রয়েছে। বদলি হওয়া আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে ৩ হাজার ৬৮১ বার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লগইন করার ভয়ঙ্কর তথ্যও পেয়েছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেশের সব কাস্টম হাউসে চিঠিও ইস্যু করেছে তারা। এদিকে গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সহকারী এক রাজস্ব কর্মকর্তার অফিসের আলমারি তল্লাশি করে ঘুষের ৬ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে দুদক। একই সময় দুদক আরেক রাজস্ব কর্মকর্তার গৃহিণী স্ত্রীর নামে তিন কোটি টাকার সম্পদ পেয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাসের সুযোগ দিয়ে বিত্তবৈভবের মালিক হচ্ছেন এ প্রতিষ্ঠানের অনেকেই। এ জন্য কাস্টম হাউসের বর্তমান ও সাবেক ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে হয়েছে দুর্নীতির মামলা। এসব ঘটনার মধ্যেই বদলি আদেশ এলো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের বর্তমান কমিশনারের। নতুন কমিশনারের দায়িত্ব পাচ্ছেন কাজী মোস্তাফিজুর রহমান।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক কাস্টম দিবসের অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ’চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গোপন ইউজার আইডি ব্যবহার করে সন্দেহভাজন পণ্য খালাস করা হয়েছে। এ জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুল হাকিম এর আগে বলেন, ’দুই কাস্টম কর্মকর্তার গোপন ইউজার আইডি ব্যবহার করে সাতটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান প্রায় চার হাজার চালান খালাস করে নিয়ে গেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এসব চালানের দাম প্রায় ৯০০ কোটি টাকারও বেশি। এগুলোতে কী পরিমাণ শুল্ক্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের বিদায়ী কমিশনার ড. এ কে এম নুরুজ্জামান বলেন, ’জালিয়াতির ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের রিপোর্ট পেলে এ ঘটনায় আরও কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। দুর্নীতি ও জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত কেউই রেহাই পাবে না।’

দেশের সব কাস্টম হাউসে শুল্ক্ক গোয়েন্দার চিঠি :অবসরপ্রাপ্ত কাস্টম কর্মকর্তার গোপন ইউজার আইডি ব্যবহার করে সংঘটিত ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরে দেশের সব কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা। এতে বলা হয়, ইউজার আইডির এমন অপব্যবহার শুল্ক্ক ফাঁকির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। চিঠিতে রাজস্ব ফাঁকি রোধ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং রোধে আরও কঠোর হওয়ার বার্তা আছে। বর্তমানে কাস্টম হাউসগুলোতে কর্মরত নেই এমন কর্মকর্তাদের নামের বিপরীতে ইস্যুকৃত আইডি বাতিল করতে বলা হয়। আর যারা কর্মরত আছেন তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডের গোপনীয়তা রক্ষা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমান ও সাবেক ১৫ কাস্টম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা :জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও শুল্ক্ক ফাঁকি দিতে নানা কৌশলে সহায়তার অভিযোগে এরই মধ্যে কাস্টমের বর্তমান ও সাবেক ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তাদের মধ্যে আছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক যুগ্ম কমিশনার জুয়েল আহমেদ, চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহিদুল ইসলাম ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এইচ এম হায়দার। কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। আবার পণ্য শনাক্তকরণের মিথ্যা কোড ব্যবহার করে পাইপ আমদানি ও খালাস প্রক্রিয়ায় সরকারের সাড়ে ৫২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা (শুল্ক্কায়ন গ্রুপ-৮) জেএম আলী আহসান ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ মো. হারুনুর রশিদসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। স্বর্ণ চোরাচালান ঘটনায় যোগসাজশ থাকায় কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শুল্ক্ক ফাঁকি দিতে সহায়তা করায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক সহকারী কমিশনার সাজেদুল হক, সাবেক চিফ অ্যাপ্রাইজার আবুল হাশেম, সাবেক প্রিভেন্টিভ অফিসার বাহারুল ইসলাম ও নিলাম শাখার সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট একেএম ফজলুল হকের বিরুদ্ধেও হয়েছে দুর্নীতির মামলা। আবার পণ্যের দাম কম দেখিয়ে রাজস্ব কম নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় কারাগারে আছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের দুই রাজস্ব কর্মকর্তা পি বি ?পাল ও সাইফুর রহমান। সপ্তাহ দুয়েক আগে কাস্টমের স্টাফ শাখায় দায়িত্বরত রাজস্ব কর্মকর্তা (প্রশাসন) নাজিম উদ্দিনের অফিস কক্ষের আলমারি তল্লাশি করে ঘুষের ৬ লাখ টাকা পায় দুদক। একই সময় রাজস্ব কর্মকর্তা আমজাদ হাজারীর গৃহিণী স্ত্রীর নামে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ থাকায় স্ত্রীসহ তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তা শেখ আকরাম হোসেনের সম্পদ যাচাই-বাছাই করে দুদক ১ কোটি ৯৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৩৭ টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারায় তাকে আট বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের গোপন কোড জালিয়াত চক্রের হাতে :ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জারার এন্টারপ্রাইজের একটি সন্দেভাজন চালান (বি/ই নং:সি-৯২০৯২৮) খালাস না করতে চট্টগ্রাম কাস্টমসকে ২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুরোধ জানায় শুল্ক্ক গোয়েন্দা। একই সঙ্গে পণ্য চালানের বিএল লক করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর চালানটি কায়িক পরীক্ষার জন্য আমদানিকারক ও তার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়। কিন্তু তারা কেউই উপস্থিত হননি। পরে খোঁজ নিয়ে শুল্ক্ক গোয়েন্দা জানতে পারে, চালান শুল্ক্কায়ন না করার অনুরোধ সত্ত্বেও ওইদিনই চট্টগ্রাম কাস্টমস (২৪ জুন) চালানটির বিল অব এন্ট্রি গ্রহণ, একই দিন শুল্ক্কায়ন ও শুল্ক্ক আদায় করে। ২৬ সেপ্টেম্বর পণ্য চালানটি বন্দর থেকে খালাসও করে ফেলে তারা। এ বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে এখন পাওয়া গেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য। শুল্ক্ক গোয়েন্দার বিএল লক অবমুক্ত করতে অবসরপ্রাপ্ত কাস্টম কর্মকর্তা ডিএএম মুহিবুল ইসলামের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের ইউজার আইডি ব্যবহার করা হয়। ডিএএম মুহিবুল ইসলাম ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত ছিলেন। সে সময় পণ্য খালাসের জন্য কাস্টম হাউস থেকে তার ই- মেইলের ঠিকানায় একটি ইউজার আইডি দেওয়া হয়, যেটি ব্যবহার করতেন তিনি। ওই কর্মকর্তা পরে অন্য দপ্তরে বদলি হয়ে ২০১৫ সালে অবসরে যান। কিন্তু তার আইডি ব্যবহার করে খালাস হতে থাকে একের পর এক চালান। চট্টগ্রাম কাস্টমসে ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১৬ বার কাস্টমসের গোপনীয় সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে লগইন ও লগআউট করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ফজলুল হকের ইউজার আইডি ব্যবহার করেও জালিয়াত চক্র খালাস করেছে অনেক চালান। তার আইডি থেকে ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৮১ বার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লগইন করা হয়েছে। অথচ এ কর্মকর্তা বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে কাজ করছেন।

চার হাজার চালান খালাস করে নিয়ে গেছে ৭ সিঅ্যান্ডএফ :কাস্টমস কর্মকর্তাদের ইউজার আইডির অপব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য চালান খালাস নেওয়া ৭টি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা। এগুলোর মধ্যে শুধু ছয়টি প্রতিষ্ঠানই গত পাঁচ বছরে খালাস করেছে ৩ হাজার ৬৫১টি চালান। শুল্ক্ক গোয়েন্দার ধারণা, ৯০০ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত চার হাজার চালান খালাস করেছে এরা। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- মেসার্স লাইলা ট্রেডিং কোম্পানি, এমঅ্যান্ডকে ট্রেডিং করপোরেশন, এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চাকলাদার সার্ভিস, মজুমদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, স্মরণিকা শিপিং কাইজেন লি. ও লাবণী এন্টারপ্রাইজ লি.। এসব সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের বিস্তারিত জানাতে ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছে শুল্ক্ক গোয়েন্দা। খালাস হওয়া পণ্যে শুল্ক্ক ফাঁকি কত হয়েছে সেটিও খুঁজে বের করছে তারা। এরই মধ্যে ঢাকার কাকরাইল থেকে আটক করা হয়েছে এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান চাকলাদারকে।

Facebook Comments

" আইন ও বিচার " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ