Foto

এফডিসিতে গানের বুলবুলকে অশ্রুসিক্ত বিদায়


অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানের স্রষ্টা ও সুরের বুলবুলকে বিদায় জানাল শিল্পী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা। বুধবার দুপুরে গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লাশ এফডিসিতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।তাকে শেষ দেখায় কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।সহকর্মীদের কান্নায় সিক্ত হয় বুলবুলের কফিন।


জীবদ্দশায় চলচ্চিত্রের বহু গানে সুর দিয়েছেন বুলবুল। তার কালজয়ী গানগুলো গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, কনক চাপা, কুমার বিশ্বজিত।তারা গানের এ বুলবুলের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।

দুপুর ২টায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মরদেহ নিয়ে আসা হয় এফডিসিতে। এখানে অনুষ্ঠিত হয় তার দ্বিতীয় জানাজা। এফডিসির মসজিদের ইমাম জানাজা পড়ান।

জানাজা নামাজে অংশ নেন চিত্রনায়ক আলমগীর, বরেণ্য গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, চিত্রনায়ক রিয়াজ, জায়েদ খান, প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু প্রমুখ।

নামাজ শেষে চলচ্চিত্রের মানুষেরা বুলবুলের স্মৃতিচারণ করেন। তাদের সেই স্মৃতিচারণ ছিলো অশ্রুসিক্ত।

এফডিসিতে জানাজা শেষে বুলবুলের লাশবাহী গাড়িটি এখন মিরপুরের পথে। উদ্দেশ্য শহীদ বুদ্ধিজীব কবরস্থান। সেখানেই চিরনিদ্রায় যাবেন মুক্তিযোদ্ধা ও গানের কিংবদন্তি পুরুষ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সঙ্গীতজ্ঞ ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

বেলা পৌনে ১১টায় বুলবুলের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়। বেলা ১১টা ৫ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর পর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষ থেকে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এর পর পরই সর্বস্তরের মানুষ তাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ১২টা ৪০ মিনিটে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। নিরবতা শেষে তার লাশবাহী গাড়ি ঢাবির উদ্দেশে রওনা দেয়। এখানেই তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি)। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের উদ্দেশে রওনা হয় কফিন।

অসংখ্য বাংলা জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর আফতাব নগরের বাসায় হার্টঅ্যাটাকে মারা যান।

বরেণ্য গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সংগীত ও শিল্পাঙ্গনে। তার অকালে চলে যাওয়া সহকর্মীদের কেউ মেনে নিতে পারছেন না। শোকে স্তব্ধ সবাই।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৭৮ সালে ’মেঘ বিজলী বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন।

সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আবদুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনকচাঁপাসহ বাংলাদেশি প্রায় সব জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীর গাওয়া বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। ১৯৭৬ সাল থেকে তার নিয়মিত গান করা। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

এ জনপ্রিয় শিল্পীর জন্ম ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায়। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বুলবুল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাইফেল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রণাঙ্গনে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে বহু জনপ্রিয় গান লিখেছেন ও সুর করেছেন।

’এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’, ’আয় রে মা আয় রে’, ’উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম’, ’সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ’মাঝি নাও ছাইড়া দে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ’সেই রেললাইনের ধারে’, ’মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেব না’-এমন বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা এ শিল্পী।

তিনি প্রেমের জন্য লিখেছেন- ’আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ’ভাড়া কইরা আনবি মানুষ’, ’প্রেমের তাজমহল’সহ আরও বহু জনপ্রিয় গান।

ব্যক্তিগত জীবনে এক সন্তানের জনক ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তার ছেলে সামির আহমেদ।

বুলবুল রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন।

Facebook Comments

" বিনোদন " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ