Foto

একুশের বইমেলা, আদর্শ প্রকাশনী ও যুক্তি-বুদ্ধির উল্টোরথে বাংলা একাডেমি


বছর তিনেক আগের কথা, পরিচিত একজন ফোন করে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে জানতে চাইলো— আদর্শ প্রকাশনীর কর্ণধার মাহবুবুর রহমান জামাত-শিবিরের লোক কি না? শুনে আশ্চর্য হলাম। মাহবুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জুনিয়র ছিল। আমরা এসএম হলে একই রুমেও থেকেছি দীর্ঘদিন। তারচেয়েও বড় কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিল সে। যে সময়টার কথা বলছি, তখন বিএনপি-জামাত ক্ষমতাসীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে দখলদারিত্ব, দুঃশাসন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের মধ্যে আছি আমরা। বাংলা বিভাগের ছাত্র মাহবুব ছাত্র ইউনিয়নের পাশাপাশি চিন্তাশীল ধারার পত্রিকা ‘দিয়াশলাই’ এর সাথে যুক্ত ছিল।


অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর নৃশংস জঙ্গিবাদী হামলার পর মুক্তচিন্তার পক্ষে যে ছাত্র-আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল মাহবুবের। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরোনোর পরেও তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে আমার। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রকাশনা ব্যবসাকে, বৈচিত্র্যময় নানান বই প্রকাশ করে মুক্তবুদ্ধির পক্ষে ভূমিকা রেখে চলেছে। আকস্মিক তাকে জামাত-শিবির আখ্যায়িত করার কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না। বরং যিনি আমার কাছে ওই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম— এমনটা মনে হওয়ার কারণ কী? জানা গেল, কারণ হিসেবে তিনি বিবেচনা করেছেন আদর্শ প্রকাশনী থেকে কবি আল মাহমুদের কবিতাসমগ্রসহ আরো কয়েকটি বই প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টিকে। পাশাপশি জানালেন, তিনি শুনেছেন— আদর্শ প্রকাশনী থেকে নাকি জিহাদী বইও প্রকাশ হয়েছে। শুনেতো আমার আক্কেল গুড়ুম।

সাথে সাথে ধাঁ করে অন্য একটি ইন্টারেস্টিং ঘটনা মনে পড়ে গেল। কয়েক বছর আগে গুরুতর রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালে মিরপুর দশ নম্বর থেকে পুলিশের হাতে আটক হয় পরিচিত এক ছোট ভাই। পুলিশ তার ব্যাগ সার্চ করে একটি জিহাদী বই পেয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। বইটির নাম জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা। লেখকের নাম পারভেজ আলম, বইটি প্রকাশ করেছে মাহবুবের আদর্শ প্রকাশনী। পুলিশ অবশ্য খুব দ্রুতই ভুল বুঝতে পেরে আটককৃতকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু অন্য অনেকের ভুলের অবসান আজও হয়নি। সেই আলোচনায় পরে আসছি। ব্লগ জেনারেশনে বেড়ে ওঠা সবচেয়ে চিন্তাশীল ও মেধাবী একজন পারভেজ আলম। আমাদের দুর্ভাগ্য যে তীব্র ইচ্ছা থাকার পরেও পারভেজ দেশে থাকতে পারেননি। নাস্তিক ব্লগার হিসেবে মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হন পারভেজ।

জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা বইটিকে ধরেও সোশাল মিডিয়ায় কয়েকটি মৌলবাদী পেইজে পারভেজের মুণ্ডুপাত করা হয়। ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন ধারা হয়ে সালাফী রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান, গতি-প্রকৃতি ও ভবিষ্যত নিয়ে পারভেজ লেখেন এই মৌলিক গ্রন্থ— যা দারুণ আলোচিত, সমালোচিত ও পাঠকপ্রিয় হয়। বইটি প্রকাশ করে প্রকাশক মাহবুব নিজেকেও কিছুটা ঝুঁকিগ্রস্ত করেছেন অবশ্যই, তবে এ নিয়ে ওকে বিচলিত হতে দেখিনি কখনো। খুব ছোট করে শুরু করা আদর্শ প্রকাশনী অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই প্রকাশনা জগতে শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। তার কারণ মূলত তাদের প্রকাশনার বৈচিত্র্য। সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকদের ফিকশন সহ গবেষণা-গণিত-ধর্ম-দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে শত শত বই প্রকাশ করেছে আদর্শ। চিন্তার মুক্তি বা বুদ্ধির মুক্তি যেটাই বলি না কেন, তার জন্য সবচেয়ে জরুরী বিষয় হল— বৈচিত্র্যময় নানান চিন্তা ও টেক্সট-এর সাথে পাঠকের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়া। সম্প্রতি যেসব তরুণ প্রকাশকরা ঝুঁকি নিয়ে হলেও কাজটি করে চলেছে, তাদের অন্যতম হিসেবে মাহবুবের নামটি উল্লেখ না করে উপায় নেই।

বাংলা একাডেমি ও একুশে বইমেলা নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ও আবেগ অসীম। তাই এ দুটোকে কেন্দ্র করে যুক্তিবুদ্ধির উল্টোরথ চলতে দেখলে আমরা ভয়ানক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। বাস্তবতা হচ্ছে, গত কয়েক বছরই বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলার প্রাক্কালে এরকম কিছু না কিছু অদ্ভুতুড়ে সিদ্ধান্ত আমাদের হতবাক করে দেয়। বইমেলায় রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেওয়া, শ্রাবণ প্রকাশনীর জন্য স্টল বরাদ্দ না দেওয়া ইত্যাদির প্রতিবাদে বাংলা একাডেমির সামনে আমাদের প্রতিবাদ করতে হয়েছে। এবারকার অদ্ভুত সিদ্ধান্তটি হল— আদর্শ ও অন্য আরেকটি প্রকাশনা সংস্থাকে বইমেলায় স্টল বরাদ্দ না দেওয়া। কেন এই সিদ্ধান্ত, অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো অফিসিয়াল কারণ জানা যায়নি। কর্তৃপক্ষ এক বাক্যে নিরাপত্তা বিষয়টিকে ইস্যু করেছেন। তবে আন-অফিসিয়ালি অন্য কারণের কথাও জানা যাচ্ছে— তবে কোনটি যে আসল কারণ তা অনুমান করা শক্ত। শোনা যাচ্ছে, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময়ে মাহবুবের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আন্দোলনের পক্ষে, বিশেষত সরকার-দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে সমালোচনা করে পোস্ট দেয়ার বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। তবে অনুমানের উপর কোনো কিছু নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় আসলেই।

ঘটনা যাই হোক না কেন, কোনো ধরনের রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে বাংলা একাডেমি এ ধরনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ার রাখে কি না— তা এই আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। সেই সাথে অন্য একটি গুরুতর শকিং রিয়ালিটিও আলোচনায় না রেখে পারা যাচ্ছে না। মোটামুটি নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে, বইমেলায় আদর্শ প্রকাশনী যেন স্টল বরাদ্দ না পায় সে ব্যাপারে গুটি চালছেন অন্য আরেকজন প্রভাবশালী প্রকাশক। যিনি সরকার-দলীয় রাজনীতি করেন, এই পরিচয়কে প্রকাশক সমিতির মধ্যে নানান অন্যায্য সুবিধা নেয়া ও ছড়ি ঘোরানোর কাজে ব্যাবহার করতে চান। আদর্শের মাহবুবের সাথে তার দ্বন্দ্বটা মূলত ব্যবসায়িক।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও গবেষণা নিয়ে লেখালেখি করেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় এরকম কয়েকজন লেখকের পাণ্ডুলিপি পাওয়া নিয়ে এই দুই প্রকাশকের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। অন্যান্য ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের মতো প্রকাশনা জগতেও প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, শিল্পের বিকাশের স্বার্থে সুস্থ প্রতিযোগিতা কাম্যও বটে— কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে উল্লেখিত প্রভাবশালী প্রকাশক মাহবুবকে ব্যবসায়িকভাবে ঘায়েল করার জন্য রাজনৈতিক ভিন্নমতকে ব্যবহার করার অসুস্থ্ পথ বেছে নিয়েছেন। সরকার-দলীয় লোকদের কাছে মাহবুবের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট তিনি সরবরাহ করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে একজন ব্যক্তি ব্যবসার স্বার্থে কতটুকু নৈতিক থাকবেন বা অনৈতিক হবেন তা বিচার করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা দুরূহ। এই কাজের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু আমাদের উদ্বেগ সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন আমরা দেখি বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের নোংরা কূট-কৌশল বাস্তবায়নের কাজে লাগানো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের আশা আকাঙ্ক্ষায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান আমাদের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল।

আমাদের প্রকাশনা শিল্পের চলমান গতি-প্রকৃতি হিসেবে ধরলে, একুশে বইমেলা একজন প্রকাশকের কাছে কৃষকের নবান্নের মত। প্রকাশনা ব্যবসা এখানে সহজ নয় মোটেও। একজন তরুণ প্রকাশকের মালিকানাধীন আদর্শ প্রকাশনী কয়েক বছরে যে বিনিয়োগ এবং প্রচেষ্টা চালিয়েছে— একটা বইমেলায় অনুপস্থিতি তার অনেকটুকুকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। কাউকে বিশেষ ব্যবসায়িক সুবিধা করে দিতে বা সামান্য রাজনৈতিক ভিন্নমতকে গুঁড়িয়ে দিতে বাংলা একাডেমি কোনোভাবেই এরকম একটি ভয়ানক কাজের ভাগিদার হতে পারে না। আশা করি, সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই বাংলা একাডেমির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটবে।

যুক্তি-বুদ্ধি ও জ্ঞানকে পাথেয় করে আমরা প্রগতির দিকে অগ্রসর হই। প্রগতিশীলতা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের নাম নয়, চিন্তা-জ্ঞানের বৈচিত্র্য ও বহুমুখীনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে প্রগতির রথ এগিয়ে যায়। কোনো নির্দিষ্ট রাজনীতি বা মতাদর্শ চাপিয়ে দিয়ে বৈচিত্র্য ধ্বংস করে এই রথকে উল্টো পথে চালিত করা প্রতিক্রিয়া বা মৌলবাদের কাজ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারীরা প্রগতি বলতে বৈচিত্র্যের ঐক্য না বুঝে স্টিগমাটাইজ এক মতাদর্শকেই বোঝেন কেবল। বুদ্ধিবৃত্তিক এই বৈকল্য ক্রমাগত ছায়া ফেলছে সবখানে, বাংলা একাডেমিও এর ব্যতিক্রম থাকতে পারেনি। গত কয়েক বছরে তার প্রভুত নমুনা আমাদের দেখতে হয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও আমার প্রত্যাশা— অচিরেই যুক্তি-বুদ্ধির এই উল্টোরথ পাল্টা পথে ফিরবে। ফিরতেই হবে, ভয়শূন্য মুক্ত পরিবেশে নির্বিঘ্ন জ্ঞান চর্চার স্বার্থে। শেষবেলায় রবীন্দ্রনাথই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন বরাবরের মত— চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি…। এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকে আমরা পিছু হঁটে যাব না।

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ