Foto

উদ্বেগ আছে, উদ্যোগ নেই


নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটেস্ট না করা এবং বারবার গ্যাস নেয়ার ঝামেলা এড়াতে বড় যানবাহনে অতিরিক্ত সিলিন্ডার সংযোজনের কারণে সিএনজি চালিত প্রায় তিন লাখ গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতিতে গাড়ির ফিটনেসের সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডার রিটেস্ট বাধ্যতামূলক করার ছক তৈরি করা হলেও বিআরটিএর দায়িত্বহীনতার কারণে তা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অথচ এ উদ্বেগ নিরসনে পরবর্তীতে আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।


এমনকি গাড়ির ফিটনেসের সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডার রিটেস্ট বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা কী কারণে ভেস্তে গেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তা এখনো খুঁজে দেখেনি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিআরটিএ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও আরপিজিএল-এর সমন্বয়হীনতা এবং আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকায় যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকি এড়ানোর উদ্যোগ সফল করা সম্ভব হয়নি। কেননা সব ধরনের সিলিন্ডারের রিটেস্টের অনুমোদন দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। আর সিএনজি কনভার্সনসহ সিলিন্ডার রিটেস্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে সরকারের রূপান্তরিক প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)। তাদের অনুমোদন ছাড়া সিএনজি কনভারসন কিংবা রিটেস্টিং (পুনঃপরীক্ষা) প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে তা অবৈধ হবে। অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে অদ্যাবধি যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকি নিরসনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। অথচ প্রতি বছর ফিটনেসের সময় সিএনজি চালিত গাড়ির সিলিন্ডার রিটেস্টিং বাধ্যতামূলক করা হলে এর বিস্ফোরণ থেকে সংঘটিত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন বিস্ফোরক বিষেজ্ঞরা। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৮০ সিএনজি কনভার্সন ওয়ার্কশপ রয়েছে। দেশে ১৬ বছর ধরে সিএনজিচালিত গাড়ি চলছে। সরকারের কাছে থাকা হিসাবে বলা হচ্ছে, দেশে প্রায় পৌনে তিন লাখ গাড়ি এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেল থেকে সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব গাড়িতে সিলিন্ডার রয়েছে সোয়া চার লাখের বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, সিএনজি কনভার্সন সেন্টারসমূহে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে। আগের দুই বছর যোগ করলে পাঁচ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ এক লাখ ৫ হাজার থেকে বড়জোর সোয়া লাখ সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে। এ হিসেবে তিন লক্ষাধিক সিলিন্ডার এখন পর্যন্ত একবারের জন্যও রিটেস্ট করা হয়নি। পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য সংযুক্ত সিএনজি সিলিন্ডার টানা ১৬ বছর ধরে ব্যবহারের ভয়ানক তথ্যও পাওয়া গেছে। যানবাহন চালকরা জানান, প্রতিটি গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্টিংয়ের জন্য দু-তিন দিন সময় লাগে। এ ছাড়া রিটেস্টিং বাবদ ২০ থেকে ৪০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য দুই হাজার টাকা, ৪০ থেকে ৬০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য আড়াই হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৮০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য তিন হাজার টাকা এবং ৮০ লিটারের বেশি প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। তাই গণপরিবহনের গাড়ির মালিকরা সহজেই তা করাতে চান না। কারণ এতে রিটেস্টিং খরচের পাশাপাশি যে সময় নষ্ট হয় তাতে গাড়ির মালিকদের বাড়তি গচ্চা গুনতে হয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাঝে মধ্যে কিছু প্রাইভেটকারের পুনঃপরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তবে বাস-ট্রাক বা অন্য যানবাহনগুলোর কোনো তথ্যই তাদের কাছে নেই। অথচ গত তিন বছরেই দেড় শতাধিক সিএনজিচালিত যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি গাড়িতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মানিকগঞ্জ দেশের বেশকিছু এলাকায় বাসা-বাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাস দিয়ে চালানো হচ্ছে অটোরিকশা। এ গ্যাসের সিলিন্ডার চালকের আসনের নিচে বা যাত্রীদের আসনের পেছনে বসানো হচ্ছে। যা বিস্ফোরিত হয়ে এরইমধ্যে সংঘটিত হয়েছে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। বিষয়টি বিআরটিএর আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো অবগত হলেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে তারা বরাবরের মতো গড়িমসি করছে। এ সুযোগে ঢাকা মহানগরী থেকে তুলে দেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিকশাগুলো বিভিন্ন মফস্বল শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। যা রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আলী আহম্মেদ খান বলেন, সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট সংস্থা নেই। যেসব সংস্থা মান নিয়ে কাজ করে তাদেরও মান যাচাইয়ে সঠিক সক্ষমতা নেই। বিস্ফোরক পরিদপ্তর এ বিষয়ে দেখার করা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তারা পারছে না। তবে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ’প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার জন্য আমরা বছর দু’য়েক আগে মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম। তারাও বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, দেশে পুনঃপরীক্ষা সেন্টারের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ফলে এটি আইনের মধ্যে ঢুকালে ওই রিটেস্ট সেন্টারগুলোতে এমন চাপ পড়বে তখন লেজেগোবরে অবস্থা হয়ে যাবে। এ কারণে তখন আইনের মধ্যে বিষয়টি ঢোকানো হয়নি। ফলে গাড়ির মালিকরা ইচ্ছেমতো হয় পরীক্ষা করাচ্ছেন, নতুবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। আর আইনের মধ্যে কিছু না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও কোনো সুযোগ নেই।’ প্রাকৃতিক গ্যাস রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয়। সারাদেশে ৫৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার ছিল ১৪টি। তা এখন বেড়ে হয়েছে ১৯টি। বিআরটিএর পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটলেই শুধু প্রশাসনের টনক নড়ে। এ সময় তড়িঘড়ি করে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে ক’দিন না যেতেই দুর্ঘটনায় উদ্বেগে যেমন ভাটা পড়ে, তেমনি উদ্যোগ থমকে যায়। তার ভাষ্য, ফিটনেসের সময় গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার রিটেস্টিংয়ের দায়িত্ব বিআরটিএকে দেয়া হলে তা তারা যথাযথভাবে পালন করবে। তবে এজন্য আগে আইন প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি সিলিন্ডার রিটেস্টিংয়ের মতো লজিস্টিক সাপোর্টও নিশ্চিত করা জরুরি। দক্ষতা ও সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও কারো ঘাড়ে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলে তা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হবে বলে মন্তব্য করেন ওই বিআরটিএ কর্মকর্তা।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ