Foto

আমাদের রাজনীতিকেরা কী পারবেন?


রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—কথাটি খুবই প্রচলিত। আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, রাজনীতি মানব সমাজের দ্বিতীয় আদিম পেশা। তাঁর বক্তৃতার পর আমেরিকার বিশ্লেষকরা মানবের এক নম্বর আদিম পেশা নিয়ে নানা বিতর্কে লেগে গেলেন! সে বিতর্কের সুরাহা হয়নি। এটাও অন্য বিতর্কের মাঝে হারিয়ে যাওয়া আরেকটি বিষয়!


আমেরিকার রাজনীতিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো সব সময়েই নাটকীয় হয়। অনেক সময়ে ধারনাই করা যায় না, কোন প্রার্থী কোন সময় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। দলীয় প্রাইমারিতে প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হয়ে উঠে। নানা কারণে যাঁরা সরে দাঁড়ান, তাদের বিদায়ী বার্তা বেশ উপভোগ্য থাকে। পশ্চিমারা সবকিছুতেই পরিশীলিত। মনের ক্ষোভ আর বেদনাকে চাপা দিয়ে সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা তাঁরা সব সময় করেন।

আমেরিকার হালের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদাহরণ বাদ দিলে, দেখা যায় রাজনীতিবিদরা চরম ক্ষোভ, বঞ্চনা আর বেদনার সময়েও সবচেয়ে সুন্দর করে বক্তৃতা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় বা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় পরিবারের কথাটিই সবার আগে বলেন। এ সময় স্বামী/স্ত্রী, সন্তানেরা হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রার্থীর বক্তব্যের সমর্থনে। তাঁরা প্রায়শই বলেন, এত দিন পরিবারকে সময় দিতে পারিনি। বাকি জীবন পরিবারকেই দিতে চাই। অবশ্য এসব কথাবার্তার কিছুদিন পরই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যে স্ত্রীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে কথাটি বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। নতুন প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েছেন ওই রাজনীতিবিদ। ফলে রাজনীতিবিদদের মর্মস্পর্শী বক্তৃতাও বিশ্বাস করার লোক সর্বত্রই অল্প।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অনেকেরই সময় নেই পরিবারকে দেখভাল করার। পরিবারের কারও জানাজায় শামিল হওয়ার চেয়েও নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তাঁরা রাস্তায় রাস্তায় ঘোরেন। পির ফকিরের দরবারে ধরনা দেন। মনোনয়ন আসে ওপর থেকে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা থাকল, তাঁর চেয়েও জরুরি হয়ে দাঁড়ায় অন্য হিসেব। কেউ বলতেই পারে, যে নিজের পরিবারের পাশে সহানুভূতি নিয়ে দাঁড়াতে পারে না, সে অন্যদের পাশে দাঁড়াবে কীভাবে? জনগণের পছন্দ নিয়ে যিনি প্রার্থী নন, তিনি জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হবেন কী করে?

প্রবাসে বসে বাংলাদেশের লোকজন দেশের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। অনেকেই দীর্ঘদিন থেকে দেশের বাইরে থাকায় রাজনীতির হাল হকিকত তেমন জানেন না। মনে করছেন, দেশ আগের মতোই আছে। কেউ মনে করছেন, তথ্য প্রযুক্তির উন্নতি আর ডিজিটাল বিপ্লবের পর দেশটা একদম পশ্চিমা না হলেও কাছাকাছি চলে এসেছে।

দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে একেক আসনে একই দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন। ছেলে দাঁড়িয়েছেন বাবার সঙ্গে। জামাই-শ্বশুর মনোনয়ন নিয়েছেন একই আসনে। দেশের বাইরে যাঁরা থাকেন, তাঁদের অনেককেই বোঝানো যাচ্ছে না ,এ মনোনয়ন দলীয় প্রাইমারিতে দেওয়া মনোনয়ন নয় । একই আসনে চূড়ান্ত ভোট যুদ্ধে নামার লড়াই । নানা কারণে একই দলের একাধিক প্রার্থী। জীবন ভর মাঠে থেকেছেন যিনি, মনোনয়নের বেলায় তাঁর নাম নিচের দিকে।

৯ ডিসেম্বর প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার কথা। অনেকেই করবেন। কেন করবেন ? কীভাবে করবেন? এ নিয়ে প্রার্থীদের হয়তো প্রস্তুতি আছে। আমেরিকায় আলোচিত সব রাজনীতিবিদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় সুন্দর একটা বক্তৃতা দেন। আমাদের নেতাদের কেউ কেউ হয়তো এখান থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারেন। মনের বেদনা চাপা দিতে না পেরে কোনো প্রার্থী অশোভন কিছু করে/বলে ফেলতে পারেন । কেউ কেউ আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম—বলে ফরিয়াদও জানাতে পারেন!

আমেরিকার গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ধরা খেয়ে প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বক্তৃতা আমরা কাজে লাগাতে পারি। প্রাইমারিতে শুরুর দিকে এগিয়ে থাকা টেড ক্রুজ বলেছিলেন, আমাদের যা ছিল তা উজাড় করে দিয়ে দিয়েছি। তার মানে প্রচার তহবিলে টান পড়েছে। আর পেরে উঠছেন না। টেড ক্রুজ তাঁর সরে দাঁড়ানোর বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমি আগেই বলেছি, জয়ের পথ যতক্ষণ খোলা থাকবে ততক্ষণ আমি লড়ে যাব। এখন দেখছি জয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আমি স্বাধীনতা আর সংবিধান রক্ষার জন্য লড়াই অব্যাহত রাখব।

মার্কো রুবিও, যাকে ট্রাম্প লিটল মার্কো বলেছিলেন প্রচারের সময়। সেই হতাশ মার্কো রুবিও বললেন, আমাদের দলের কাঠামো বদলাতে হবে। একজন রাজধানীতে বসে থাকবেন আর জনগণকে ওপর থেকে দেখবেন, আমরা এমন নেতৃত্ব চাই না। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই না, যাঁরা যুবকদের বলবে, অপেক্ষা কর। তোমার সময় হয়নি। আমরা এমন নেতা চাই না, যে শুধু নির্বাচনে জয় নিয়েই বেশি উৎসাহী। নৈতিক অবস্থানে থেকে সমস্যার সমাধানে যে নেতৃত্বের কোনো আগ্রহ নেই- আমদের এমন নেতৃত্বে বদল আনতে হবে।

কার্লি ফিওরিনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী লড়াইয়ে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিউলেড প্যাকার্ডের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। আমেরিকার শীর্ষ নারী নির্বাহীদের একজন। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সময় তাঁর দেওয়ার বক্তৃতা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আমার নির্বাচনী প্রচার ছিল দেশকে জনগণের কাছে নিয়ে আসার জন্য। যে রাজনৈতিক শ্রেণি ক্ষমতাবানদের আর তাদের সঙ্গে সম্পর্কিতদের সেবা করে আসছে; ফাঁকা বুলি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিনের পর দিন রাজনীতি করে যাচ্ছে —নির্বাচনে না থাকলেও আমি সেই ধারা বদল করার আন্দোলন করে যাব।

আমাদের রাজনীতিকদের অনেকে দলীয় কারণে, অনেকে নির্বাচনী আইনের মারপ্যাঁচে ছিটকে পড়বেন। হয়তো পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বয়সও থাকবে না। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউ কী পারবেন না কার্লি ফিওরিনা, টেড ক্রুজ বা মার্কো রুবিও-র মতো কথা বলে রাজনীতিতে থাকতে? যদি না পারেন তাহলে প্রমাণ হবে, সুযোগ না পেয়েও তাঁরা আশায় থাকবেন, কিন্তু প্রচলিত ধারার একটু বাইরে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারবেন না। বিশ্বের দ্বিতীয় আদিম পেশাটার আর এ দেশে সময়োপযোগী হয়ে ওঠা হবে না।

Facebook Comments

" মতামত " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ