Foto

আপনি কি হুয়াওয়ে স্মার্টফোনটি ফেলে দেবেন?


চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে কালো তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান বাণিজ্য সংকটের আগুনে ঘি ঢেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিষয়টি আরো স্পর্শকাতর দিকে মোড় নেয় যখন হুয়াওয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল। মার্কিন প্রশাসনকে খুশি রাখতেই যে গুগলের এমন সিদ্ধান্ত, সেটি বলা বাহুল্য। এর ফলে আপনার হাতে থাকা হুয়াওয়ে স্মার্টফোনে কী কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।


কী ঘটেছে আসলে?

হুয়াওয়ে এবং এর সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসনের কালো তালিকাভুক্তকরণের অংশ হিসেবে হুয়াওয়েকে সফটওয়্যার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে গুগল।

এর মানে কী?

স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে যে অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, তাতে থাকে একাধিক সফটওয়্যার। হুয়াওয়ের স্মার্টফোনগুলোও এমন সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এই সফটওয়্যারগুলো থাকে পরতের মতো। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এই পরতগুলো এমন : ইউজার ইন্টারফেস, গুগল সার্ভিসেস (গুগল প্লে, জিমেইল, ইউটিউব ইত্যাদি), অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এবং ফোনের হার্ডওয়্যার নিয়ন্ত্রণকারী সিস্টেম সফটওয়্যার।

এই সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে হুয়াওয়েকে ‌’গুগল সার্ভিস সেবা’ দেওয়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে গুগল। যার ফলে সরাসরি‌ অ্যান্ড্রয়েডের সফটওয়্যার আপডেট পাবে না হুয়াওয়ে স্মার্টফোন।

তার মানে কি হুয়াওয়ে আর অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না?

পারবে। অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের পর্দার আড়ালের ভিত্তিটির নাম ’অ্যান্ড্রয়েড ওপেন সোর্স প্রজেক্ট’ বা ’এওএসপি’। এটি ’ওপেন সোর্স’ মানে যে কেউই এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারে। এই ’এওএসপি’ আবার নির্মিত হয়েছে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে। তাই গুগল তাদের সংস্করণটি হালনাগাদ (আপডেট) করলে অন্যদেরও এটি পাওয়ার সুযোগ থাকছে।

তাই গুগল-হুয়াওয়ে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় যতক্ষণ পর্যন্ত না হুয়াওয়ে ’এওএসপি’ থেকে অ্যান্ড্রয়েডের হালনাগাদ সংস্করণ বের করছে, গুগল থেকে সরাসরি নিজেদের স্মার্টফোনে কোনো আপডেট পাবেন না হুয়াওয়ের গ্রাহকরা। অবশ্য হুয়াওয়ে কিন্তু তার নিজের দেশে, অর্থাৎ চীনে তার গ্রাহকদের ফোনের অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ নিজেরাই হালনাগাদ করে দিয়ে আসছে। কারণ, চীনে গুগলের বেশিরভাগ সেবাই বন্ধ।

এ ছাড়া হুয়াওয়ে-গুগল বিচ্ছেদের আরো একটি অর্থ হলো, গুগল প্লে সার্ভিসের মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েডে এখন থেকে যত ধরনের নতুন ফিচার আনবে, সেগুলোর কোনোটিই পাবে না ইউরোপ-আমেরিকায় বিক্রি হওয়া হুয়াওয়ের স্মার্টফোনগুলো।

তাহলে কি হুয়াওয়ে স্মার্টফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে?

না। এ মুহূর্তে আপনার হাতে থাকা হুয়াওয়ে স্মার্টফোনটি আগের মতোই চলবে। কারণ, হুয়াওয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের বিক্রি হওয়া সব স্মার্টফোনেই নিয়মিত সিকিউরিটি আপডেট ও বিক্রয়োত্তর সব সেবাই অব্যাহত থাকবে।

হুয়াওয়ে স্মার্টফোনে কি গুগল সার্ভিস কাজ করবে?

হ্যাঁ করবে। এ মুহূর্তে বাজারে থাকা সব হুয়াওয়ে স্মার্টফোনে গুগল, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও অন্যান্য গুগল অ্যাপস আগের মতোই কাজ করবে। তবে হুয়াওয়ে এ মুহূর্তে নতুন কোনো ফোন বাজারে আনলে সেগুলোতে এসব ফিচার কাজ করবে না।

হুয়াওয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা কি আর কোনো ধরনের আপডেট পাবেন না?

পাবেন। গুগল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমানে যেসব ফোন ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোতে গুগল প্লের সব আপডেটই নিয়মিত পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতি মাসের সিকিউরিটি আপডেটও ’এওএসপি’র মাধ্যমে দিতে পারবে হুয়াওয়ে।

হুয়াওয়ে স্মার্টফোনে কি অ্যান্ড্রয়েডের হালনাগাদ ভার্সন পাওয়া যাবে?

বর্তমানে আমরা যেসব স্মার্টফোন ব্যবহার করছি, তার বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে।

প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ভার্সন (১.০) মুক্তি পায় ২০০৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। এরপর ধাপে ধাপে অ্যান্ড্রয়েডের সংস্করণ পরিবর্তিত হতে থাকে। ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে অ্যান্ড্রয়েডের ভার্সনগুলো বর্ণমালা অনুযায়ী নামকরণ করা হয়। ’কাপকেক’ নামে সেই অ্যান্ড্রয়েডের ভার্সন ছিল ১.৫। ক্রমান্বয়ে যে অ্যান্ড্রয়েড ভার্সনগুলো স্মার্টফোনে এসেছে, সেগুলো হলো—’ডোনাট’ (ভার্সন ১.৬), ’এক্লেয়ার’ (ভার্সন ২.০-২.১), ’ফ্রোয়ো’ (ভার্সন ২.২-২.২.৩), ’জিনজারব্রেড’ (২.৩-২.৩.৭), ’হানিকম্ব’ (৩.০-৩.২.৬), ’আইসক্রিম স্যান্ডউইচ’ (৪.০-৪.০.৪), ’জেলিবিন’ (৪.১-৪.৩.১), ’কিটক্যাট’ (৪.৪-৪.৪.৪), ’ললিপপ’ (৫.০-৫.১.১), ’মার্শম্যালো’ (৬.০-৬.০.১), ’নোগাট’ (৭.০-৭.১.২), ’ওরিয়ো’ (৮.০-৮.১), ’পাই’ (৯.০) ও ’অ্যান্ড্রয়েড কিউ’ (১০.০)।

বরাবরই নিয়মিতভাবে অ্যান্ড্রয়েডের হালনাগাদ ভার্সনগুলো পাচ্ছিল হুয়াওয়ের ফোনগুলো। গুগলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও ’এওএসপি’র মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েডের হালনাগাদ করতেই পারবে হুয়াওয়ে। তবে আগে যেমন গুগলের বদৌলতে আগেভাগেই হালনাগাদ ভার্সন পেয়ে যেত ফোনগুলো—যেমন ’অ্যান্ড্রয়েড কিউ’র ’বেটা সংস্করণ’ সুবিধা—সেগুলো এখন আর পাবে না হুয়াওয়ে স্মার্টফোনগুলো।

হুয়াওয়ের ব্যবসায় এর কী প্রভাব পড়বে?

এ বছরের প্রথম তিন মাসে পাঁচ কোটি ৯০ লাখ স্মার্টফোন বাজারে এনেছে হুয়াওয়ে, যার সবই অ্যান্ড্রয়েড ফোন। উল্লেখ্য, হুয়াওয়ের অর্ধেক ফোন বিক্রি হয় চীনে, বাকিটা সারা দুনিয়ায়। গত বছর হুয়াওয়ের আয়ের ৪৫.১ শতাংশই এসেছিল স্মার্টফোন বিক্রি থেকে। তাই সে জায়গাটিতে হুয়াওয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

হুয়াওয়ে কী করতে পারে?

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হুয়াওয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এর প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই চীনের একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ঝেংফেই ইতোমধ্যে বলেছেন, হুয়াওয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে ভুল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ’শীর্ষে ওঠার’ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতটি অনিবার্যই ছিল।

হুয়াওয়ে অবশ্য অনেকদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের বিকল্প একটি পরিকল্পনা আছে। নিজেদের একটি অপারেটিং সিস্টেম চালু করার জন্য কাজও করছে তারা। এরই মধ্যে অপারেটিং সিস্টেমটি হুয়াওয়ে স্মার্টওয়াচে ব্যবহারও করেছে। তবে গুগল সার্ভিস ও অ্যাপসবিহীন স্মার্টফোন চীনের বাইরে বিক্রি করাটা হুয়াওয়ের জন্য ভীষণ কঠিন হবে।

এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে হুয়াওয়ের কম্পিউটার ব্যবসায়ও। কারণ, হুয়াওয়ের ল্যাপটপ ও ডেস্কটপে যেসব যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই আসে ইনটেলসহ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। এ ছাড়া এসব কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ব্যবহৃত হয়। আর মাইক্রোসফটও গুগলের পথেই হাঁটবে—এমন আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

Facebook Comments

" প্রযুক্তি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ