Foto

আট বছর ধরে খবর নেই রাতারাতি তোড়জোড়


অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল, প্রসাধনী ও প্লাস্টিকের গোডাউন এবং কারখানা স্থানান্তরের উদ্যোগ আট বছরেও দৃশ্যমান হয়নি। সর্বশেষ চকবাজার ট্র্যাজেডির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল কারখানা দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশনা দেন। এর এক দিনের মধ্যে নতুন করে আরও দুটি কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের উপযোগী স্থান চিহ্নিত করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ সোমবার ব্যবসায়ীসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করবে মন্ত্রণালয়।


গত বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬৭ জন প্রাণ হারান। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসন। ওই অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন পর ৬ জুন আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি জরুরি সভার সিদ্ধান্তে ঢাকা মেট্রোপলিটন আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন, কারখানা ও দোকান অপসারণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ইকবাল খান চৌধুরীকে সভাপতি করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্স ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল সংশ্নিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে বিসিকের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে কেমিক্যালপল্লীর জন্য স্থান নির্ধারণ কমিটি এবং টেকনিক্যাল কমিটি করে। একই সঙ্গে স্থান নির্ধারণ কমিটিকে বলা হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় উপযুক্ত স্থান চিহ্নিত করে দুই মাস সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে। কারিগরি কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে দিতে বলা হয়। এর পর দফায় দফায় বৈঠক হলেও দাহ্য পদার্থের কারখানা ও গুদাম স্থানান্তরে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত শুক্রবার শিল্প মন্ত্রণালয়কে ৫০ একর থেকে বাড়িয়ে ৩০০ একর জমিতে রাসায়নিক পল্লী করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরই শুরু হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তোড়জোড়।

দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ী, বিসিকের বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্টরা জানান, দুর্ঘটনার আলোচনা থিতিয়ে পড়তেই এ উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে পিছুটান তৈরি হয়। তারা পুরান ঢাকা ছাড়তে রাজি হননি। ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে প্রকল্প প্রণয়নে পিছিয়ে পড়ে বিসিক। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিসিক বহুতল ভবনে কারখানা ও গুদাম করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ব্যবসায়ীরা আলাদা প্লট দাবি করেন। এই টানাপড়েনে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি অবস্থায় বিভিন্ন সংস্থার সিদ্ধান্ত পেতে দপ্তরে পড়ে থাকে কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের উদ্যোগ। ২০১১ সালে উদ্যোগ নেওয়ার পর বিসিক ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি (ডিপিপি) করে। কিন্তু তখন ব্যবসায়ীরা স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় ২০১৬ সালে পুরান ঢাকায় অভিযান শুরু হলে টনক নড়ে ব্যবসায়ীদের। তখন পুরান ঢাকার দুর্ঘটনা এড়াতে কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউন স্থানান্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দেন। এর পর বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে ব্যবসায়ীদের তিন সংগঠন- বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ পেইন্ট অ্যান্ড ডাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। বর্তমানে পুরান ঢাকায় দুই হাজার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৯০০ প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের জন্য গত বছর শুধু ৫০ একরের একটি স্থান নির্ধারণ করা হয়। ওই স্থানে কেমিক্যালপল্লী স্থাপনের জন্য গত ৩০ অক্টোবর একনেকে প্রকল্প অনুমোদন হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২০১৫ সালে প্লাস্টিক শিল্পনগরী করার জন্য একনেকে প্রকল্প অনুমোদন পায়। ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জে এই পল্লী স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্প নেওয়ার পর প্রায় চার বছর পার হতে চললেও এখনও ভূমি অধিগ্রহণ হয়নি। এখন যৌথভাবে ভূমি জরিপ শুরু করার কথা রয়েছে।

কেমিক্যালপল্লীর অগ্রগতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. সাইফুল আলম সমকালকে বলেন, পল্লী করতে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণকৃত্বায় ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও এই প্রকল্পের কোনো অর্থ ছাড় হয়নি। নতুন করে এডিপি বরাদ্দ হলে তখন অধিগ্রহণ করা হবে। সংশ্নিষ্টদের সহযোগিতা পেলে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে এই পল্লী চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এই পল্লীতে পুরান ঢাকার সব ব্যবসায়ীকে প্লট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত শনিবার দিনভর শিল্প সচিব ও বিসিকের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় ও বিসিকের কর্মকর্তারা দিনভর ঢাকার আশপাশে সব এলাকা ঘুরে পল্লী করার জন্য আরও ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, দুটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি কেরানীগঞ্জের হযরতপুরের কানাই চর আরেকটি ওই এলাকারই জগন্নাথপুরের বেইলি ব্রিজের কাছের জমি। এর আশপাশে অনেক জমি রয়েছে। এই চিহ্নিত জমি সব একফসলি। যেখানে চাইলে অনেক বড় পল্লী করা সম্ভব হবে।

কেরানীগঞ্জ ছাড়াও সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জমির খোঁজ-খবর নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। শেষ পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের দুটি স্থান চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানানো হয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আজ সোমবার এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এই বৈঠকে সব পক্ষের মতামত নিয়ে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম স্থানান্তরের সময় বেঁধে দিয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এই বৈঠকে শুধু কেমিক্যালের বিষয় নয়, প্লাস্টিকসহ সব ধরনের দাহ্য পদার্থের কারখানা ও গোডাউন দ্রুত স্থানান্তরের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হবে।

এ জন্য গতকাল রোববার শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এফ এম আমীর হোসেন সই করা এক চিঠিতে বলা হয়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা-পরবর্তী দ্রুত করণীয় নির্ধারণের বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের সভাপতিত্বে একটি জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সোমবার (আজ) শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার উপস্থিত থাকবেন। এই জরুরি সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব এবং বিসিআইসি, বিসিক, রাজউক, বিএসএফআইসি চেয়ারম্যানসহ এফবিসিসিআই সভাপতির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিএসটিআই, ফায়ার সর্ভিস ও কলকারখানা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি এবং সংস্থা প্রধানরাও বৈঠকে থাকবেন।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ডিপিপিতে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমিতে কেমিক্যালপলল্গী নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। বিসিকের প্রথম ডিপিপি ছিল এক হাজার ৪১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সাত তলাবিশিষ্ট ১৭টি সুপার স্ট্রাকচার ভবন তৈরি করে সেখানে কেমিক্যাল গুদাম ও দোকান সরানোর। এ প্রকল্পের ব্যয় ব্যবসায়ীদের বহন করার কথা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তাতে আপত্তি তোলেন। তারা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পল্গট দাবি করেন। এ অবস্থায় বিসিকের ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশ দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। এর পরই নতুন করে কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও মৌজায় কেমিক্যালপলল্গী স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়।

এফবিসিসিআইর কেমিক্যাল-বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. বেলায়েত হোসেন সমকালকে বলেন, ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় গুদাম ও কারখানা সরানোর উদ্দেশ্যে সমঝোতা স্মারক সই করেছেন। এখন দ্রুত প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দিলে ব্যবসায়ীরাও কারখানা স্থানান্তর করতে পারবেন। তিনি বলেন, বিসিকের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেছেন ব্যবসায়ীরা। মূলত বিসিকের কার্যক্রমের ধীরগতির কারণে পিছিয়ে ছিল কেমিক্যালপল্লী।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ