Foto

অগ্রাধিকার দিন শিক্ষা স্বাস্থ্য সুশাসনে


আর্থ-সামাজিকভাবে এগোলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং বৈষম্য দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুশাসনে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। তাহলে দারিদ্র্য কমার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন হবে।


গতকাল ’অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুসরণীয় :নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এমন পরামর্শ দিয়েছে। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত

অনুষ্ঠানে সংস্থার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও আগামীতে করণীয় তুলে ধরা হয়।

সিপিডি বলেছে, কারিগরি শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শিক্ষা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আজীবন শেখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মানসম্পন্ন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। শিক্ষাকে সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। সিপিডি স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা ও তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে জোর দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ খাতের পেশাগত উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সুশাসনের উন্নয়ন, নীতি ও পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সংস্থা সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। এ ছাড়া আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বাড়ানো, অতিদারিদ্র্য দূর করার জন্য বিশেষায়িত পদক্ষেপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ এসেছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশ এগিয়েছে এবং আগামীতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের সময়োপযোগী পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য গবেষক, উদ্যোক্তাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা চান তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এখনও দেশের মূল সমস্যা দারিদ্র্য। দারিদ্র্য নেকড়ের মতো তাড়া করছে। এজন্য সরকার দারিদ্র্য দূর করার পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার মানসম্মতভাবে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। সরকার বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, মানুষের কাছে অর্থ গেলে এবং সবাই বিদ্যুৎ পেলে তারাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকারের মান বাড়াতে পারবে। বর্তমানে দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ সেবা দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে ’গেল গেল’ একটা রব উঠেছে। কিন্তু এর মধ্যেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বিনিয়োগ হয়েছে তা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সুষম উন্নয়ন হচ্ছে। তিনি পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে সাম্প্রদায়িক যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো সংশোধন করা হবে উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকার সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করবে না।

অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পাঠ্যপুস্তকে এখনও সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদের মতো বিষয় রয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিএমএর সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি হয়েছে। তবে সেবার মান আরও ভালো হওয়া দরকার। এ খাতে গবেষণা এখন জরুরি।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইদুজ্জামান বলেন, উন্নয়নের জন্য ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দূর, সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরামর্শ দেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সুশাসন নিশ্চিত করা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশকে একমাত্র ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সুশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতে মামলাজট সৃষ্টি হচ্ছে সুশাসনের অভাবে। অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বিএনপি সমর্থক এই পেশাজীবী নেতা বলেন, ’বর্তমানে সুশাসনের জন্য প্রতিবন্ধক হচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) হয়তো নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ। যে কারণে জামিনযোগ্য মামলা উনি আপিল করে উচ্চ আদালতে নিচ্ছেন।’

সিপিডির ফেলো রওনক জাহান বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক ভাবনাও শুনতে হবে। শিক্ষক নেতা অধ্যাপক কাজী ফারুক আহমেদ মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূল ধারায় নিয়ে আসা এবং স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান শিক্ষার মান বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

অর্জন :সিপিডি বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, যা গত দশক ধরেই স্থিতিশীল রয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। দারিদ্র্যও কমছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে এবং ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হতে পারবে। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা সবক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। বৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষক বৃদ্ধির কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। শিক্ষা খাতে মাথাপিছু ব্যয়ও বেড়েছে। তবে শিক্ষা খাতে আরও জোর দিতে হবে। সংস্থাটি বলছে, স্বাস্থ্য খাতেও অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। গড় আয়ু বেড়েছে। জন্ম ও মৃত্যুহার কমেছে। কমেছে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার। প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু হারও কমেছে। সরকারের নানান উদ্যোগের ফলে এ অবস্থায় এসেছে বাংলাদেশ। তবে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় এখনও কম। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ২০৯ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এ খাতে ব্যয় আরও বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সিপিডি বলেছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল সরকারের। কিন্তু সরকার ইতিমধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করেছে।

চ্যালেঞ্জ :এতসব উন্নয়নের পরও বাংলাদেশের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, উদ্বেগজনক কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আর প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টন হচ্ছে না। সিপিডি বলেছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতি বছর ২১ লাখ লোক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু বিবিএসের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১২ লাখ ৯৬ হাজার মানুষের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। এ থেকে বলা যায়, বছরে ৮ লাখ লোক কাজের সুযোগ না পেয়ে বেকার থাকছে। এদিকে বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপকভাবে। ২০১০ সালে দেশের ধনাঢ্য ৫ শতাংশ মানুষ সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের চেয়ে ৩২ গুণ বেশি ধনী ছিল, যা ২০১৫ সালে এসে এই পার্থক্য ১২১ গুণে পৌঁছেছে।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ